নাগরিক সংবাদ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জরুরি

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০, ৯:২১ পূর্বাহ্ণ
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জরুরি
ফাইল ছবি

মহামারি করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে এক, দুই, তিন থেকে বর্তমানে ছয় মাসের অধিক সময় ধরে অচলাবস্থা বিরাজ করছে দেশের শিক্ষাঙ্গণে। বেশ কয়েক দফা ছুটি বাড়ানোর পর আবার ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে এ বছর কিংবা আগামী বছরের শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে সংশয় আছে।

শিক্ষাজীবনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা এইচএসসি। করোনার কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। অবশেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরাসরি পরীক্ষা না নিয়ে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার প্রাপ্ত মার্ক গড় করে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অটো পাসের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকেও পরীক্ষা ব্যতীত অটো প্রমোশনের মাধ্যমে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা পুরোদমে চলায় তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার বিধান না থাকায় সেশনজটসহ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক লাখ শিক্ষার্থী।

পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে গবেষণাসহ নানা দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে শিক্ষার্থীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্তব্যরত হয়। ১৮ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রায় ৪ মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। নানা অজুহাত, সিস্টেমের দোহাই কিংবা আন্তরিকতার অভাবে সেই অনলাইন ক্লাসেও ভালো ফল পাচ্ছে না বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আবার অনলাইনে ক্লাস চালু রাখার নিয়ম থাকলেও সব ধরনের পরীক্ষা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় তীব্র সেশনজটের বিষফোঁড়া বহন করতে হচ্ছে এসব শিক্ষার্থীদের। আবার অনেক শিক্ষার্থী অনার্স ও মাস্টার্সের সর্বশেষ সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে না পেরে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় দিন পার কারছে এসব ভাগ্যবিড়ম্বিত শিক্ষার্থী কিংবা তাদের একটি চাকরির ওপর ভর করে থাকা স্বজনেরা।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক থেকে জানা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত অনলাইন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা পরিস্থিতির আগের চেয়ে পরে মানসিক সমস্যা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ অনিদ্রায় ভুগছে। এ ছাড়া ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ এবং ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও শঙ্কার কথা উল্লেখ করে। ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ সামগ্রিকভাবে আতঙ্কিত। ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে যে তাদের কাছে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়েছে, যা শিক্ষার্থীদের কখনো আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করার আশঙ্কা তৈরি করছে।

এমতাবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। দেশের শিল্পকারখানা, অফিস–আদালত, গণপরিবহন, পর্যটন নগরীগুলোকে খুলে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে চলছে সবকিছু। সব অঙ্গনসমূহকে স্বাভাবিক করে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যঝুঁকির অজুহাত দেখিয়ে মাসের পর মাস বন্ধ রাখা ঠিক না ভাবা উচিত।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি খুলে দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে চলমান সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অন্তত অনার্স ও মাস্টার্সের সর্বশেষ সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে কার্যকর সুপারিশমালা তৈরি করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেক দূর পিছিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রও। দেশের অর্থনীতিসহ অনেক খাতেই এর বিরূপ প্রভাব তীব্র হচ্ছে। তাই চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একযোগে কাজ করা অতীব জরুরি।

  • শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়