রাজধানী

‘সাকার’ যায় না গলিতে

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬:২১ পূর্বাহ্ণ
নালার জটবাঁধা বর্জ্য সরাতে ব্যবহৃত হচ্ছে সাকার যন্ত্র। সরু সড়কে এটি প্রবেশ করায় অন্য কোনো যান এ পথে চলাচল করতে পারেনি। সম্প্রতি পুরান ঢাকার কলতা বাজার এলাকায়
নালার জটবাঁধা বর্জ্য সরাতে ব্যবহৃত হচ্ছে সাকার যন্ত্র। সরু সড়কে এটি প্রবেশ করায় অন্য কোনো যান এ পথে চলাচল করতে পারেনি। সম্প্রতি পুরান ঢাকার কলতা বাজার এলাকায়
ছবি: হাসান রাজা

ঢাকার বেশির ভাগ অলিগলি সরু হলেও দুই সিটি করপোরেশন নালা পরিষ্কার করতে যে পাঁচটি ‘জেট অ্যান্ড সাকার’ কিনেছে, তা সরু গলিতে ঢুকতেই পারে না। যেসব গলির রাস্তা ৮ থেকে ৯ ফুট চওড়া, শুধু সেসব রাস্তায় ‘সাকার’ যন্ত্র (দেখতে অনেকটা পানির ট্রাকের মতো) ঢুকতে পারে। এ অবস্থায় ৪৭ কোটি টাকায় কেনা পাঁচটি সাকার যন্ত্র কতটা কাজে লাগছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নালায় জমাট বাঁধা বালু, মাটি, প্লাস্টিকসহ আবর্জনা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অপসারণ করতে সাকার ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে নালার ১৫ ফুট দূরের বর্জ্যও টেনে আনা যায়। আর নালার ৯০ ফুট পর্যন্ত প্রতিবন্ধকতা (বর্জ্যের জট) দূর করা যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সাকার যন্ত্র আছে তিনটি আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) আছে দুটি। এর মধ্যে জনবলের সংকটের কারণে উত্তর সিটির একটি যন্ত্র ঠিকমতো ব্যবহারই করা যাচ্ছে না।

নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, বাস্তবতা বা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কোন ধরনের পরিকল্পনা করলে তা কাজ আসবে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মনোযোগ কম। এর চেয়ে যেনতেনভাবে কেনাকাটা করতেই তাদের আগ্রহ বেশি।

ঢাকার দুই সিটিতে পানিনিষ্কাশনের নালা আছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে দক্ষিণে আছে ৯৬১ কিলোমিটার এবং উত্তরে ১ হাজার ৬৩৭ কিলোমিটার।

ডিএসসিসির কেনা সাকার ৮ থেকে ৯ ফুট চওড়া রাস্তায় ঢুকতে পারে। অবশ্য ৯ ফুটের রাস্তায় যন্ত্রটি ঢুকলে তখন ওই রাস্তায় অন্য কোনো গাড়ি চলতে পারে না। যেসব সড়কের অন্তত ২০ ফুট চওড়া, ওই সব সড়কে এটি ব্যবহার হলে ফাঁকা জায়গায় অন্য গাড়ি চলতে পারে। অন্যদিকে ডিএনসিসির যন্ত্রটি ৭ ফুট চওড়া রাস্তায় ব্যবহার করা যায়, তখন অবশ্য ওই সড়ক হয়ে অন্য গাড়ি চলাচল করতে পারে না। দক্ষিণ সিটির সাকার তিনটি থাকলেও উত্তর সিটির তুলনায় সেখানে সরু গলির সংখ্যা বেশি।

খরচ ৪৭ কোটি টাকা

২০১৫ সালে ডিএনসিসি ৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ করে প্রথম সাকার কিনেছিল। এরপর ২০১৮ সালে ৯ কোটি ৪৩ টাকা দিয়ে দ্বিতীয় যন্ত্রটি কেনে তারা। দুটিই কেনা হয় নিজস্ব অর্থায়নে। আর ডিএসসিসি ২০১৭ সালে তিনটি সাকার কিনে। তাদের খরচ পড়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সাকার এক ঘণ্টা কাজ করলে ১৮ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয় বলে জানান সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

২০১৫ সালে ডিএনসিসি যখন প্রথম যন্ত্রটি কেনে, তখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখায় নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন আবুল হাসনাত। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির যান্ত্রিক শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন। আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আশরাফুল আলম জানান, উত্তর সিটিতে সরু গলি ও রাস্তার সংখ্যা তুলনামূলক কম। যে গলিতে যন্ত্রটি প্রবেশ করতে পারে না, ওই গলি পাশের সড়কে যন্ত্রটি রেখে পাইপের মাধ্যমে নালা পরিষ্কারের কাজ করা হয়।

ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগ বলছে, ১০০ মিটার বা ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের নালা পরিষ্কার করতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। যন্ত্রটি পরিচালনা করতে সব মিলিয়ে চারজন লোকের প্রয়োজন হয়। এটি ঘণ্টায় প্রায় আড়াই টন বর্জ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম। যন্ত্রটির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা জমা রাখার যে ট্যাংক রয়েছে, সেটি পূর্ণ হতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। অন্যদিকে সনাতনী পদ্ধতিতে হাতে কাজ করলে দুই টন বর্জ্য সংগ্রহ করতে ১০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৫ ঘণ্টা শ্রম দিতে হয়।

কত দিন ব্যবহার করা হয়

ডিএনসিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে তাদের দুটি সাকার যন্ত্র সব মিলিয়ে ১০ দিন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে কাজ করেছে ৭৮ ঘণ্টা। ওই সময়ে বিভিন্ন নালায় জমে থাকা ৮২টি নালার জমাট বাঁধা বর্জ্য অপসারণ করেছে।

অন্যদিকে ডিএসসিসি জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১১৭ দিন তারা সাকার ব্যবহার করেছে। তবে সংস্থাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ বলছে, এটির ব্যবহার ব্যয়বহুল এবং সব সড়কে প্রবেশ করতে না পারায় সমস্যা হয়।

একটি অলস বসে আছে

জনবলের সংকটের কারণে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকায় কেনা উত্তর সিটির একটি সাকার ব্যবহার হচ্ছে না। কারণ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রটি চালাতে সংস্থাটিতে মাত্র একজন দক্ষ কর্মী (অপারেটর) আছেন। এতে কার্যত একটি যন্ত্র অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকছে। অবশ্য সংস্থাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা পালাক্রমে দুটি যন্ত্রই ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে ডিএসসিসির তিনটি সাকার ব্যবহারের জন্য চালক আছেন ছয়জন। পালাক্রমে তাঁরা কাজ করেন।

উত্তর সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যান্ত্রিক শাখার সহকারী প্রকৌশলী ইকরামুল হক খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, গাবতলীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। এই যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ চুরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণেই ধলপুরের ওয়ার্কশপে রাখা হয়।

উত্তর সিটির দুটি সাকার রাখা হয় দক্ষিণ সিটির আওতাধীন ধলপুরের ওয়ার্কশপে। সিটি করপোরেশন ভাগের সময় ধলপুরে ওই ওয়ার্কশপের একটি অংশ উত্তর সিটিকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে গাবতলীতে উত্তর সিটির অস্থায়ী যান্ত্রিক ওয়ার্কশপ রয়েছে। তবে গাবতলীতে গাড়িগুলোর নিরাপত্তা ও সাকার পরিচালনাকারী কর্মীদের অসুবিধার অজুহাতে যন্ত্রগুলো এখনো ধলপুরেই রাখা হচ্ছে। ফলে উত্তরের কোনো এলাকায় নালা পরিষ্কারের প্রয়োজন হলে ধলপুর থেকে তা আনতে হয়। এতে বাড়তি জ্বালানি খরচ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাকার পুরোপুরি ব্যবহারের উপযোগী নয়। এ ছাড়া রাজধানীর নালার আকার একই রকমের নয়। সব ধরনের নালাও পরিষ্কার করতে পারে না সাকার। সঠিক পরিকল্পনা না করে কোনো কাজ করলে তার সুফল পাওয়া যাবে না।