জেলা

১৭ বছর পর হারানো মায়ের কোলে সন্তানেরা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২:১২ অপরাহ্ণ
প্রায় দেড় যুগ আগে হারিয়ে যাওয়া মা আবেদা বেগমের সঙ্গে দুই ছেলে আলামিন ও আলাউদ্দিন
প্রায় দেড় যুগ আগে হারিয়ে যাওয়া মা আবেদা বেগমের সঙ্গে দুই ছেলে আলামিন ও আলাউদ্দিন
প্রথম আলো

ঝড়বৃষ্টির এক রাতে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন আবেদা বেগম (৭০)। সকালে তাঁকে না পেয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন সন্তানেরা। এলাকায় মাইকিং, থানায় সাধারণ ডায়েরি, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন। কিন্তু কোনোভাবেই আবেদাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন সন্তানেরা, খুঁজতে থাকেন এখানে–ওখানে। এক দিন, দুই দিন করে এভাবেই কেটে যায় ১৭ বছর।

অবশেষে হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পেয়েছেন সন্তানেরা। মাকে পেয়ে আনন্দ–অশ্রুতে সিক্ত হয়েছেন ছেলে আলামিন শেখ ও আলাউদ্দিন শেখ। ঘটনাটি ঘটেছে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখো গ্রামে। খুলনার এক যুবকের সঙ্গে শ্যামনগরের এক তরুণীর বিয়ের সূত্র ধরেই খোঁজ মেলে হারিয়ে যাওয়া মায়ের।

আলামিনদের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সিমছড়া গ্রামে। থাকেন খুলনা শহরের জোড়াগেট এলাকায় মন্টুর কলোনিতে। পেশায় ট্রাকচালক আলামিন জানান, ২০০২ সালের দিকে তাঁর মায়ের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। সবকিছু মনে রাখতে পারতেন না। তাঁকে বিভিন্ন চিকিৎসক ও কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। এমনকি ঝাড়ফুঁক করিয়েছেন। যে যা বলেছেন, সেখানে ছুটে গেছেন মায়ের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। ২০০৩ সালে ঝড়বৃষ্টির এক রাতে আবেদা বেগম কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।

দেড় যুগ আগে হারানো মাকে খুঁজে পাওয়ার খবরে স্থানীয়দের ভিড়। সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখো গ্রামে
দেড় যুগ আগে হারানো মাকে খুঁজে পাওয়ার খবরে স্থানীয়দের ভিড়। সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখো গ্রামে
প্রথম আলো

আলামিন জানান, তিনি যখন যেখানে যেতেন, সেখানেই তাঁর মাকে খুঁজতেন। মানুষের কাছে তাঁর মায়ের বর্ণনা দিয়ে সন্ধান চাইতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল মাকে খুঁজে পাবেন তিনি। দীর্ঘ ১৭ বছর পরে তাঁর বিশ্বাস সত্য হয়েছে। শুক্রবার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর পর পরিচয় দেওয়ার দরকার হয়নি। মুখ দেখেই দুই চোখ দিয়ে জল ঝরতে থাকে মমতাময়ী মায়ের। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। নাম ধরে ডাকও দেন। ছেলেও হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। শুরু হয় মর্মস্পর্শী এক দৃশ্যের।

বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। সবাই খুশি। তিন ভাই, চার বোন, বাবা, খালা, মামা, ফুফুসহ আত্মীয়স্বজনেরা দেখতে আসছেন মাকে। যেন বাড়িতে উৎসব চলছে।
আলামিন শেখ, ছেলে

আলামিন জানান, ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী জিল্লুর রহমান নামের এক যুবকের বিয়ে হয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামে। তিনি বরযাত্রী হিসেবে ওই বিয়েতে গিয়েছিলেন। বিয়ের পর জিল্লুরের শ্যালিকা মাসুরা খাতুন বেড়াতে আসেন তাঁদের বাড়িতে। গল্পে গল্পে জানতে পারেন, আবেদার হারানোর কথা। বর্ণনা শুনে মাসুরা জানান, তাঁদের গ্রামের চাঁদনীমুখো বাজারে কয়েক বছর ধরে এমন একজন বৃদ্ধা থাকেন। আলামিন তাঁর মায়ের ছবি দেখান মাসুরাকে। ছবি দেখে নিশ্চিত হতে না পেরে মাসুরা সিদ্ধান্ত নেন, ওই বৃদ্ধার ছবি তুলে পাঠাবে আলামিনের কাছে। বৃহস্পতিবার ছবি পাঠায় তাঁর কাছে। ছবি দেখে প্রাথমিকভাবে তিনি নিশ্চিত হন, এ বৃদ্ধাই তাঁর মা। ওই ছবি তাঁর বাবা আবদুল হাই শেখসহ খালাদেরও দেখান। তাঁরা নিশ্চিত হন, ছবির ওই বৃদ্ধাই হারিয়ে যাওয়া আবেদা বেগম।

শুক্রবার আলামিন আর আলাউদ্দিন দুই ভাই আসেন চাঁদনীমুখো বাজারে। সেখানে যেয়ে দেখেন মায়ের মুখে সেই কালো তিল, ভ্রু ও পায়ে কাটার চিহ্ন। মাকে পরিচয় দিতে হয়নি, তাঁদের দেখে আনন্দ–অশ্রু ঝরতে থাকে। বুকে জড়িয়ে ধরেন তাঁদের। আনন্দে তাঁরাও কান্নাকাটি করতে থাকেন। পরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় তাঁর মাকে নিয়ে চলে যান খুলনার জোড়াগেট এলাকার বাড়িতে।

শনিবার বিকেল চারটার দিকে মুঠোফোনে আলামিন আর আলাউদ্দিন দুই ভাই বলেন, ‘আজ সারা দিন মিডিয়ার লোকজন আসছেন। মাকে ফিরে পাওয়ার গল্প শুনছে। বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। সবাই খুশি। তিন ভাই, চার বোন, বাবা, খালা, মামা, ফুফুসহ আত্মীয়স্বজনেরা দেখতে আসছেন মাকে। যেন বাড়িতে উৎসব চলছে।’

গাবুরা ইউপির চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, পথ ভুলে এলাকায় আসা মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে তাঁর সন্তানেরা খুঁজে পেয়েছেন। সন্তানদের কাছে পেয়ে মা–ও যেমন খুশি, তেমনি গাবুরাবাসীও খুশি। ছেলেদের সঙ্গে তাঁদের মাকে তাঁর নিজ ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।