বাণিজ্য

সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখন এক ভারতীয়র

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
সঞ্জীব মেহতা
সঞ্জীব মেহতা

নিয়তির কী পরিহাস, যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ১৮ ও ১৯ শতকে ভারতবাসীরা এত এত আন্দোলন করেছে, প্রাণ দিয়েছে, সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বর্তমান কর্ণধার একজন ভারতীয় উদ্যোক্তা।
১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে এই কোম্পানিটি গঠিত হয়েছিল ভারত থেকে মসলা, চাসহ নানা রকম দ্রব্য আমদানির লক্ষ্যে। ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ দুই শতাধিক ইংরেজ ব্যবসায়ীকে পূর্ব ভারতে ডাচ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য এই কোম্পানি গঠনের লাইসেন্স দেন। ১৮ শতকে বিশ্বের বস্ত্র ব্যবসায় প্রাধান্য বিস্তার করে এই কোম্পানি। নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা করার জন্য বড় এক সেনাবাহিনী ছিল এদের, এমনকি প্রয়োজনে যুদ্ধ করারও অধিকার ছিল। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশ বলপূর্বক দখল করে নেয় এরা। পাশাপাশি বাণিজ্যিক স্বার্থে তারা অনেক নির্মম কাজ করেছে। ভারতে কোম্পানির প্রধান তিনটি কেন্দ্র ছিল যথাক্রমে মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতা। কিন্তু ১৮৫৭ সালে কোম্পানির ভারতীয় সেনারা ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ (সিপাহি বিদ্রোহ) করলে কোম্পানিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরব নিউজ ও ডব্লিউআইওএন ডট কম সূত্রে এই খবর পাওয়া গেছে।

পলাশীর যুদ্ধের পরে রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফর
পলাশীর যুদ্ধের পরে রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফর
আঁকা ছবি

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনও হয়েছিল এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সংঘটিত সেই যুদ্ধে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। এরপর ধীরে ধীরে বাংলা ব্রিটিশদের অধিকারে চলে আসে। বাংলা অধিকারের পর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষ এমনকি এশিয়ার অন্যান্য অংশও নিজেদের দখলে নিয়ে আসে। অর্থাৎ ইংরেজদের সাম্রাজ্য বিস্তারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতবর্ষ সরাসরি ব্রিটেনের রানির তত্ত্বাবধানে চলে আসে। মাঝখানে ১০০ বছর ভারত কোম্পানির শাসনাধীন ছিল। সেই সময়ের কোম্পানির দুঃশাসনের স্মৃতি এখনো মানুষের সামষ্টিক স্মৃতিতে অম্লান। তবে এরপর ব্রিটিশ রানির শাসনও যে খুব সুখকর ছিল, তা নয়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোগো
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোগো

১৮৫৭ সালে বিলুপ্ত হওয়ার পর বহুকাল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুপ্ত অবস্থায় ছিল—এর স্থান ছিল স্মৃতি ও ইতিহাসের পাতায়। ২০০৩ সালের দিকে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা চা ও কফির ব্যবসার মাধ্যমে একে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। ২০০৫ সালে ভারতীয় উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামটি কিনে নেন। তখন তিনি নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন; দামি চা, কফি ও খাবার ছিল তাঁর পণ্য। ২০১০ সালে মেহতা লন্ডনের অভিজাত মে ফেয়ার অঞ্চলে কোম্পানির প্রথম দোকান চালু করেন।

যে কোম্পানি একসময় ভারতের মালিক ছিল, সেই কোম্পানির মালিক এখন একজন ভারতীয়, এটি সাম্রাজ্যকে অনেকটা পাল্টা আঘাত দেওয়ার মতো
সঞ্জীব মেহতা, সত্ত্বাধিকারী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কি উপনিবেশের কালো অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, এমন প্রশ্নের জবাবে মেহতা আরব নিউজকে বলেন, ‘পারবে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু একজন ভারতীয় এই কোম্পানি কিনে নিয়েছে, সেটা জানলে ভারতবাসীর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই হবে।’ সঞ্জীব মেহতার ভাষায়: যে কোম্পানি একসময় ভারতের মালিক ছিল, সেই কোম্পানির মালিক এখন একজন ভারতীয়, এটি সাম্রাজ্যকে অনেকটা পাল্টা আঘাত দেওয়ার মতো। তিনি আরও বলেন, আগের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচালিত হতো আগ্রাসনের ভিত্তিতে, আর এখানকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চলে সহমর্মিতার ভিত্তিতে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সোনার মোহর তৈরিরও অনুমোদন পেয়েছেন সঞ্জীব মেহতা।