বিশ্ববাণিজ্য

স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্যে বিপর্যয়

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০, ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক পণ্য রপ্তানি কমেছে ১৩ শতাংশ হারে, সেখানে এলডিসিগুলোর সমন্বিত পণ্য রপ্তানি কমেছে ১৬ শতাংশ।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সচিবালয় এলডিসির বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তা থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনটি গত বুধবার জেনেভায় ডব্লিউটিওর কার্যালয়ে এলডিসি–বিষয়ক সাব–কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, পণ্য রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি এলডিসিগুলোর সেবা খাতের রপ্তানিও ব্যাপকভাবে কমেছে। প্রাথমিকভাবে এই কমে যাওয়ার হার ৪০ শতাংশ বলে ডব্লিউটিও প্রাক্কলন করেছে।

এমনিতেই ২০১৯ সালে এলডিসির বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধীরগতি ছিল। ফলে পণ্য ও সেবা খাতের সমন্বিত রপ্তানি মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের দশমিক ৯৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। অথচ ২০১৮ সালে তা ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ।

ডব্লিউটিওর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে এলডিসিগুলোর মোট পণ্য রপ্তানি ৩ দশমিক ১০ শতাংশ কমে হয়েছে ১৯ হাজার কোটি ডলারের কিছু ওপরে। একই সময়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সমন্বিত পণ্য আমদানি দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে হয় প্রায় ২৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। সাধারণত বৈশ্বিক আমদানি ও রপ্তানিকে যোগ করে এর গড় ফল যা হয়, সেই অঙ্কটিকেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ বিবেচনা করা হয়। এলডিসির বৈশ্বিক বাণিজ্য হিস্যাও সেভাবে নির্ণয় করা হয়ে থাকে।

প্রতিবেদনে এলডিসির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পন্নকারী ৯৭টি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৯৭টি দেশই এলডিসির সিংহভাগ বাণিজ্যের অংশীদার। উল্লেখ্য, বর্তমানে ৪৭টি দেশ জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুসারে এলডিসি, যার মধ্যে ৩৬টি দেশ ডব্লিউটিওর সদস্য।

মাসওয়ারি বিশ্লেষণে ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন বলছে, জানুয়ারির তুলনায় এপ্রিলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট পণ্য রপ্তানি কমেছে ৭৪ শতাংশ, মে মাসে ৫৯ শতাংশ আর জুনে ৭১ শতাংশ।

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চলতি বছরের মার্চ-জুন সময়ে এলডিসিসহ গোটা বিশ্ব বাণিজ্যই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দুনিয়াজুড়ে দেশে দেশে লকডাউন আর পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য কমিয়ে দেওয়ায় এমনটি হয়েছে। এই চার মাসে এলডিসিগুলোর সমন্বিত পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২১ শতাংশ। তবে সব এলডিসির রপ্তানি একই হারে কমেনি, বরং দুই-তৃতীয়াংশ স্বল্পোন্নত দেশের রপ্তানি এলডিসির সমন্বিত রপ্তানি যে হারে কমেছে, তার চেয়ে বেশি হারে কমেছে।

এলডিসির শীর্ষ দুই রপ্তানিকারক দেশ অ্যাঙ্গোলা ও বাংলাদেশের রপ্তানি চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (২৭টি ইউরোপীয় দেশের জোট) যথাক্রমে ৪৬ ও ৩০ শতাংশ হারে কমেছে। এই সময়কালে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সমন্বিত পণ্য রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে ভারতে, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ। আর তা হয়েছে চারটি দেশ থেকে ভারতে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় বা ভারত আমদানি কমিয়ে দেওয়ায়। দেশগুলো হলো অ্যাঙ্গোলা (৫২ শতাংশ), বুরকিনা ফাঁসো (৮৩ শতাংশ), বাংলাদেশ (৬১ শতাংশ) ও জাম্বিয়া (৪৯ শতাংশ)। এলডিসিগুলোর প্রধান গন্তব্যের মধ্যে ভারতের পর রপ্তানি কমেছে যুক্তরাজ্যে ৩২ শতাংশ, চীনে ২৮ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২৮ শতাংশ, রাশিয়ায় ২৩ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্রে ২৩ শতাংশ।

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন আরও বলছে, এলডিসির প্রস্তুত করা পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক প্রধান আর এই তৈরি পোশাক করোনাভাইরাসের মহামারিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চ-জুন সময়কালে এলডিসির তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৮ শতাংশ আর বছরের প্রথমার্ধে কমেছে ১৮ শতাংশ।

মার্চ-জুন সময়ে নেপালের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫৮ শতাংশ, যা এলডিসিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ হার। এরপর যথাক্রমে কমেছে লেসোথো ও হাইতি (উভয়েরই ৪৯ শতাংশ হারে) এবং মাদাগাস্কারের (৩৩ শতাংশ)। তবে এ দেশগুলোর তৈরি পোশাক রপ্তানি এলডিসির মোট রপ্তানির খুব বেশি অংশ নয়।

এলডিসির মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানির শীর্ষ দেশ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি (মার্চ-জুন) কমেছে ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক রপ্তানির দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। প্রথম স্থানে আছে চীন।

উল্লেখ্য, বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) এলডিসিগুলোর মোট পণ্য রপ্তানি ১৬ শতাংশ কমে হয়েছে ৭ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশেরই রপ্তানি ১ হাজার ৬৬২ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কম।