প্র অধুনা

এলোমেলো করোনা–ভাবনা

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ
এলোমেলো করোনা–ভাবনা

অসুখ সম্পর্কে সুজান সন্তাগ তাঁর ইলনেস অ্যাজ মেটাফর গ্রন্থের শুরুতে একটি উল্লেখযোগ্য কথা বলেছেন, ‘অসুখ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনালোকিত দিক।’ মানুষ সুখ-অসুখের সমান্তরাল জগতে দ্বৈত নাগরিকত্ব ভোগ করে।

প্রাচীনকালে কেমন ছিল এর স্বরূপ, তার স্পষ্ট প্রমাণ তেমন নেই। পাথরে খোদাই করা প্রমাণ ও যুক্তিসঙ্গত কল্পনার ভিত্তিতে রচিত হয় ইতিহাস।

মানুষ খুব সচল হলো। ট্রেন, বাস, উড়োজাহাজ, জলযান—এসবে মানুষ ভ্রমণ করল এন্তার। কিন্তু হঠাৎ করোনাভাইরাস এল। মানুষ হলো অনেকটা ঘরবন্দী। ইচ্ছা হলেই উড়ে যাওয়া, ট্রেনে পাড়ি দেওয়া হলো না। আমরা কি আগের যুগে ফিরে গেলাম। আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও এক অর্থে বন্দী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, ঘর থেকে বেরুলেই মাস্ক পরে বেরুতে হবে। মাস্ক অনেকে পরছে, অনেক পরিচিত মুখ অপরিচিত মনে হচ্ছে। অতিপরিচিত প্রতিবেশীর দিকে সন্দেহের চোখে তাকানো, যদি করোনা হয়।

আক্রমণের ভয় নয়, সংক্রমণের ভয়। মানুষ কেবল নিজে বাঁচতে চায়। নিজের পরিবার বাঁচলে হলো। অন্যদের নিয়ে অনেকের তেমন ভাবনা নেই।

ঘরবন্দী কিশোর যে অনলাইনে ক্লাস করে, সে–ও ফাঁক পেলে প্রেম করছে। ভিডিও চ্যাট চলছে এর মধ্যেও। এপারে কেকা সরব, ওপারে কি নীরব কুহু হায়? সন্তোষ স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচের বেদিতে দুজনে গা–ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে বকবকানি নয়, কপোত-কপোতী যথা নয়। সেই কথামালা চলছে ভিডিওতে।

অনেকের জীবনে চলছে অগ্নিপরীক্ষা। জীবন–মৃত্যুর প্রশ্ন। কাউকে দেওয়া হচ্ছে হাই ফ্লো অক্সিজেন। কেউ ঢুকছেন ভেন্টিলেটরে। কাউকে উপুড় করে রাখা হচ্ছে, যাতে ফুসফুসে বেশি অক্সিজেন যায়, সেখান থেকে রক্তে। সহজে। না পারলে পাশ ফিরে শুতে হচ্ছে।

এন–৯৫ মাস্ক পরে চারধারে আছেন উদ্বিগ্ন চিকিৎসক, নার্স। ভৌতিক পরিবেশ। মনে হচ্ছে নভোচারীরা দাঁড়িয়ে আছেন। ঘাম ঝরছে, তাঁদের শরীর বেয়ে পা পর্যন্ত ভিজে চপচপে। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যাওয়ার উপায় নেই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। বাইরে দুর্ভাবনা নিয়ে অপেক্ষায় স্বজনেরা।

টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কথাবার্তা চলছে। মাস্ক পরুন, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। হাত সাবান–জল দিয়ে বারবার ধোবেন অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে। কিন্তু কেউ তেমন মানছে না। একদল মানুষ নির্ভয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন করোনা নেই। জনসমাবেশ আছে। বাজারে অনেক লোক। গা–ঘেঁষাঘেঁষি করে বাজার করছে। চড়া দাম হাঁকলেও লোকে কিনছে। করবে কী! পেটের ক্ষুধা তো মিটাতে হবে। বাসে ঘিঞ্জি করে লোকজন বসা। মাস্ক অনেকের নেই। কী যে হবে!

কেউ চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে আড্ডা দিচ্ছে। সব এ নষ্ট ভাইরাসের জন্য। আবার অনেকের মৃত্যুভয় থেকে ভোগান্তির ভয় বেশি। বিদেশে যাঁরা উড়াল দেবেন কাজে যোগ দেওয়ার জন্য, তাঁদের টেস্ট করা, টিকিট পাওয়া নিয়ে দারুণ ভোগান্তি।

রাস্তায় যান চলাচল অনেক। যানজট ফিরেছে। এদিকে অ্যাম্বুলেন্স চলে যাচ্ছে হাসপাতালে জরুরি রোগী নিয়ে। কোনোটি যাচ্ছে লাশ নিয়ে। লাশ দাফন, দাহ করতে আগে স্বজনেরা তেমন যেতেন না। এখন অনেকে যাচ্ছেন। ভয় মনে হয় কেটেছে। অসুখের মানে কি বদলাচ্ছে? দুর্ভাবনার আদল কি বদলে যাচ্ছে?

টেলিভিশনে ব্রিফিং শুনে শুনে মন খারাপ হতো। প্রতিদিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিলে লোক যোগ হচ্ছে প্রতিদিন। তবে সুস্থ হচ্ছেন অনেকে। এক দিন ব্রিফিং বন্ধ হলো মানে, যাক দুর্ভাবনা কমল। শুনলাম না, জানলাম না।

এ সময় অসুস্থ হলে অস্বস্তি। কারণ, অন্যের হয়রানির কারণ হতে পারি। মরেও শান্তি নাই। লাশ টানা, নানা আচার, নানা বিধিনিষেধ। মানুষ অবশ্য এখন নিঃসংকোচে যাচ্ছে শেষকৃত্যে।

কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। যে গেল, সে গেল। কিছুদিন মন খারাপ, আবার যেই সেই। অনেক উদ্বেগ–উৎকণ্ঠাকে ভুল প্রমাণ করে আশ্বাসের বাণী শোনা গেল জীবনের। টিকা বেরোবে অচিরেই এমন শোনা যাচ্ছে। চিনের সিনোভ্যাক কোম্পানির সঙ্গে ভ্যাকসিন ট্রায়াল হবে দেশে, হয়তো আমরা পাব ভ্যাকসিন, হব অংশীদার। সুড়ঙ্গের ওপারে আলো দেখা যায়। একসময় আমরা গান গেয়ে উঠি, ‘এই আকাশে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’।