প্র অধুনা

৯ ঘণ্টায় করোনা কেড়ে নিল মা–বাবাকে

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারী ২০২১, ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
মা–বাবার সঙ্গে ৬৩তম বিবাহবার্ষিকীতে তাঁদের সঙ্গে ছয় সন্তান।
মা–বাবার সঙ্গে ৬৩তম বিবাহবার্ষিকীতে তাঁদের সঙ্গে ছয় সন্তান।
ছবি: সংগৃহীত

করোনাকালে বিশ্বে চমকে ওঠার মতো কত ঘটনাই না ঘটছে প্রতিদিন। কিন্তু আমাদের মতো কষ্ট কজন পেয়েছেন, আমি জানি না। এই করোনায় মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে আমরা হারিয়েছি মা–বাবাকে।

দিনটি ছিল ১৮ মে ২০২০। বাসায় ড্রয়িংরুমে বসে হোম অফিস করছিলাম। পাশের ঘরে অশীতিপর আব্বা মো. মজিবুর রহমান পাটোয়ারী (৮৮) বিছানায় শয্যাশায়ী। আরেক ঘরে অসুস্থ আম্মা রাবেয়া বেগম (৭৬), ২–৩ দিন ধরে জ্বর জ্বর অনুভব করছেন। আম্মাই মূলত আব্বার সেবা–শুশ্রূষা করতেন।

বিকেলবেলায় বাথরুম থেকে বড় বোন-ভাবির সহায়তায় নিজের বিছানায় যাওয়ার সময় আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আম্মা এখন কেমন লাগছে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘বুঝতেছি না।’ তারপর আব্বার ঘর ডিঙিয়ে নিজের বিছানায় যাওয়ার সময় বারবার আব্বার দিকে তাকাচ্ছিলাম।

ভাবিকে বলছিলেন, ‘আমার শরীরটা ভালো না থাকায় তোমার শ্বশুরের কোনো খবর আজ নিতে পারলাম না। ঠিকমতো খাওয়াইছ তো?’ ভাবিকে বলতে শুনলাম, ‘আগে আপনি নিজে সুস্থ হয়ে ওঠেন, তারপর আব্বার খোঁজখবর নিতে পারবেন।’ তখন ছিল পবিত্র রমজান মাস। আম্মাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ভাবি ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমার বড় বোন তখনো আম্মার সেবা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

ইফতার করে, নামাজ শেষে মোনাজাত করব, এমন সময় ভাতিজি সামিয়া এসে বলল, ‘চাচু একটু তাড়াতাড়ি আসো, দাদু কেমন যেন করছে।’ ছুটে গেলাম মায়ের কাছে। আম্মা বিছানায় এপাশ–ওপাশ ছটফট করছেন আর জোরে জোরে আল্লাহকে ডাকছেন। মায়ের বুকে-হাতে গরম তেল রসুন মালিশ চলছে। দুই মিনিট বাদেই আম্মার শরীর নিথর হয়ে গেল। আমি পালস বুঝতে চেষ্টা করলাম, পেলাম না। ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন। বড় বোন-ভাবি হাউমাউ করে কাঁদলেও আমি ছিলাম বাক্‌রুদ্ধ। হাজারো স্মৃতি যেন আমাকে আঁকড়ে ধরেছে এই মুহূর্তে।

নিজেকে সামলে নিয়ে কানাডাপ্রবাসী বড় ভাই আবদুল্লাহকে ফোন দিলাম। খবর শুনেই তিনি আম্মাগো বলে এক চিত্কার দিলেন। আমার মেজ ভাই কলেজশিক্ষক গোলাম সরওয়ার ও ভাতিজা শাহরিয়ারের চার দিন আগেই করোনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাঁদের পজিটিভ ফলাফল এসেছে। তাই তাঁদের দুজনকে আলাদা দুই ঘরে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল। আর সতর্কতা হিসেবে দুদিন আগে আম্মা–আব্বাসহ পরিবারের সবার করোনা টেস্ট করানো হয়েছিল। অপেক্ষা ছিল শুধু রিপোর্ট পাওয়ার।

আম্মার মৃত্যুর পর যা করার একাই করতে হয়েছে। ছোট ভাই আহসান হাবিব লকডাউন থাকার কারণে ঢাকা থেকে আসতে পারেনি। এমনকি আমার ছোট বোন নাসরিনও শেষ মুহূর্তের দেখা দেখতে পারেনি। করোনা গোটা সমাজকে তখন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। এ প্রতিকূল পরিবেশে আমাকে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছেন আমার দুই বেয়াই আরজু ও জুয়েল।

আমরা চাচ্ছিলাম আম্মার কবর হবে আমাদের গ্রামের বাড়িতে, পৈতৃক কবরস্থানে। কিন্তু তখন করোনা নিয়ে মানুষের ভয়, আতঙ্ক অপরিসীম। রাত সাড়ে আটটার দিকে বাড়িতে আমার চাচাকে ফোন করলাম আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে কবর খোঁড়ার জন্য। তিনি আমাকে জানালেন, বাড়ির পরিস্থিতি ভালো নয়, সবাই একযোগে নিষেধ করছে বাড়িতে দাফন করতে দেবে না। তারপর পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় আমাদের বাড়িতেই মায়ের দাফন সম্পন্ন করতে পারলাম। তখন গভীর শোকের মধ্যেও মানুষের অমানবিক ও মানবিক দুটি দিকই দেখা হলো।

রাত দেড়টার দিকে আমরা দুটি অ্যাম্বুলেন্সে চাঁদপুর জেলা শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। চারদিকে সুনসান নীরবতার মধ্য দিয়ে জানাজা শেষ করে দাফন সম্পন্ন করে রাত তিনটায় আবার ফিরে আসি বাসায়।

নয় ঘণ্টার ব্যাবধানে করোনা কেড়ে নিয়েছে তাঁদের।
নয় ঘণ্টার ব্যাবধানে করোনা কেড়ে নিয়েছে তাঁদের।

মায়ের পর এবার বাবা

বাড়িতে ফিরে আসার পর আমি আব্বার বিছানার কাছে যাই। আব্বার চোখে ঘুম নেই। বিড়বিড় করে কী যেন বলে চলেছেন। আমি কিছুক্ষণ থেকে গোসল করতে যাই। সাহ্‌রি শেষে ফজরের আজান হয়ে গেছে তখন। নামাজ পড়ে বিছানায় শুতে যাব, এমন সময় ভাতিজি সামিয়া এসে খবর দিল, ‘চাচু দাদাও নেই।’

আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। কী এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত পার করেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছিলাম ‘অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর।’ এ কথার মানে কখনো উপলব্ধি করতে পারিনি। তবে সে মুহূর্তে তা খুব গভীরভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছি।

আগের রাতে যাঁরা সহায়তা করেছিলেন, তাঁরাও চললেন পরদিন। বাদ জোহর জানাজা শেষে আব্বাকেও মায়ের পাশেই দাফন করে এলাম। কী অদ্ভুত! বাড়ির একটি মানুষও শরিক হলেন না। এমনকি বাড়ির কবরস্থানের পাশে যে মসজিদ, সেখানে জোহরের আজানও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেদিন কেউ আসেননি, তাই জামাতও হয়নি। জানাজার সময় মসজিদের ইমাম সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু জানাজায় অংশ নিলেন না। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু হাসলেন। জানি না তাঁর এ হাসির রহস্য কী ছিল।

জীবন তো চলমান। চলার পথে ছড়িয়ে যায় অনেক অশ্রু, অনেক বেদনার স্মৃতি। যদি বেঁচেই থাকি আরও কিছুটা সময়, তবে অনেক বছর পর সেই সব স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে পড়ে যাবে, পৃথিবীতে একদিন করোনা এসেছিল, কেড়ে নিয়েছিল অসংখ্য প্রাণ, ফুটিয়েছিল লাখ লাখ বেদনার ফুল। মনে পড়ে যাবে, অদৃশ্য এক শত্রুর সঙ্গে কী ভীষণ লড়াই করেছিলাম আমরা! হারিয়ে যাওয়া লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে আমারও দুজন আপনজন আছেন, সে কথাও মনে পড়ে যাবে। এখন যেমন প্রতিদিনই মনে পড়ে। আপনজন দুজন আমার পরম প্রিয় বাবা আর স্নেহময়ী আমার মা। মৃত্যুর পর রিপোর্ট এলে আমরা জানতে পেরেছিলাম, মা–বাবা দুজনই ছিলেন কোভিড–১৯ পজিটিভ।

লেখক: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ঊর্ধ্বতন সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ)