নারীমঞ্চ

নারী ট্রাফিক পুলিশের নিত্য সমস্যা শৌচাগার

প্রকাশ: ২৩ েব্রুয়ারি ২০২১, ৬:০ পূর্বাহ্ণ
সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে যান ট্রাফিক পুলিশ। কিন্তু টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের।
সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে যান ট্রাফিক পুলিশ। কিন্তু টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের।
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোর মতোই ব্যস্ততা কনস্টেবল শুক্লা বসুর। যেন বসে থাকার কোনো জো নেই। তাঁর ইশারাতেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাসেল স্কয়ারের ছুটে চলা গাড়িগুলো। ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে শুক্লার মতো অনেক নারী ট্রাফিক পুলিশকে নিয়মিতই দেখা যায়। তবে আট ঘণ্টার দীর্ঘ এই ডিউটিতে ট্রাফিক পুলিশদের জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো শৌচাগারের ব্যবস্থা। ফলে দায়িত্ব পালনকালে প্রাকৃতিক ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের। এ ভোগান্তি পুরুষ ট্রাফিক পুলিশদের চেয়ে নারীদের বেলায় বেশি।

কাজের এক ফাঁকে এসে শুক্লা বলেন, ‘টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লেই তো চিন্তায় পড়ে যাই। ছেলেরা চাইলে যেকোনো টয়লেট ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু মেয়েদের জন্য তো সব টয়লেটে যাওয়া সম্ভব হয় না। হুট করে অন্য প্রতিষ্ঠানের টয়লেট ব্যবহার করতে একটু সংকোচও কাজ করে।’

রাসেল স্কয়ারে ডিউটি থাকলে সেখানকার বাস কাউন্টারগুলোর শৌচাগার ব্যবহার করেন শুক্লা। কিন্তু গণশৌচাগার হওয়ায় সেগুলোর পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর বলে জানান তিনি। শুক্লার সঙ্গে একই সিগন্যাল মোড়ে কর্মরত ছিলেন ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট নাজিয়া আফরিন। তাঁর অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের পিরিয়ডের সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। এ সময় মার্কেট, কাউন্টার বা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের টয়লেট ব্যবহার করা বেশ অস্বস্তিকর। ট্রাফিক বক্সেই যদি আমাদের জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে অনেক সুবিধা হতো।’

ট্রাফিক বক্সে কোনো শৌচাগার না থাকায় আশপাশের মার্কেট, হাসপাতাল বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয় রাস্তায় কর্মরত পুলিশদের। তবে সন্ধ্যার পর এসব অফিস বা মার্কেট বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

নারী ট্রাফিক পুলিশের নিত্য সমস্যা শৌচাগার
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

খামারবাড়ি সিগন্যালে কর্মরত সার্জেন্ট শিল্পী আক্তার জানান, দায়িত্ব ফেলে শৌচাগার খুঁজতে যাওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এখান থেকে প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট হেঁটে হাসপাতাল বা খামারবাড়ির টয়লেটে যেতে হয়। ছুটির দিনে বা রাত হয়ে গেলে ওই টয়লেটগুলো বন্ধ থাকে। তখন টয়লেট খুঁজতে আরও দূরে যেতে হয়। রাস্তায় যানজট লেগে যায় বলে ডিউটি ফেলে এতক্ষণ সময় হাতে নিয়ে তো যাওয়া সম্ভব হয় না।’

সময় নষ্টের কথা ভেবে প্রায় সময়ই প্রস্রাব চেপে রাখেন তাঁরা। আবার এসব ঝামেলা এড়াতে পানিও কম পান করেন বলে জানান শিল্পী আক্তার। তিনি ছাড়াও নগরীর আরও কয়েক নারী ও পুরুষ ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, শৌচাগারের সমস্যার কারণে অনেকের মধ্যেই পানি কম পান করা ও প্রস্রাব চেপে রাখার প্রবণতা রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এটা জানলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁরা নিরুপায় বলে সহজ স্বীকারোক্তি দিলেন কারওয়ান বাজারে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক কনস্টেবল।

২০১৫ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকে একাধিকবার নিজেদের সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছেন শিল্পী আক্তার। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ‘আশ্বাস’ মিললেও কার্যত কোনো সমাধান মেলেনি বলে জানান তিনি। আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি ও আমার সহকর্মীরা সবাই কমবেশি এ সমস্যার ব্যাপারে ওপরমহলে জানিয়েছি। নারী-পুরষ সবার জন্যই তো এটা বড় সমস্যা। এভাবে চলতে থাকলে তো আমাদের শারীরিক সমস্যাও দেখা দেবে।’

এ বিষয়ে কথা হয় পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) ও মুখপাত্র মো. সোহেল রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থাপিত ট্রাফিক বক্সগুলোর বেশির ভাগেই কোনো ওয়াশরুমের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এর ফলে বিশেষ করে আমাদের নারী সহকর্মীদের দায়িত্ব পালনের সময় বেশ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে এর সমাধানের জন্য ট্রাফিক বক্স স্থাপনকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্যদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ওয়াশরুম বা টয়লেটযুক্ত পুলিশ বক্স বা অনুরূপ কোনো সেবা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’