প্র ছুটির দিনে

প্রথম উড়োজাহাজ নিয়ে উড়লাম একা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬:২১ পূর্বাহ্ণ

বিমানবন্দরের পাইলট লাউঞ্জের জানালা দিয়ে হাত নেড়ে যাচ্ছেন আমার ফ্লাইট প্রশিক্ষক। সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমানবন্দরের কর্মী ইঞ্জিন চালুর সংকেত দিচ্ছেন সামনে দাঁড়িয়ে। ফ্লাইট প্রশিক্ষক একটু পর হাতমাইকে বললেন, ‘আই বিলিভ ইন ইউ, ফোকাস অ্যান্ড ইউ গট দিস সিলিয়া।’ ছোট্ট প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ সেসনা ১৭২-এর ককপিটে বসে ভাবছি, ‘কোনো মানে হয় এসবের!’

ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একক বিমান চালনা ক্রস কান্ট্রি ফ্লাইটের প্রথম দিন আজ। প্রায় ২৫০ নটিক্যাল মাইল রাউন্ড ট্রিপ, ৩টি বিমানবন্দরে অবতরণ। আমার ফ্লাইট বা উড্ডয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী পথ হলো—ডেটোনা বিচ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জ্বালানি নিতে ভেরো বিচ আঞ্চলিক বিমানবন্দর, সেখান থেকে বিরতির জন্য অরল্যান্ডো মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তারপর হোম এয়ারপোর্ট ডেটোনায় ফিরে আসা।

ককপিটে বসে তোলা ছবি
ককপিটে বসে তোলা ছবি

হাতের আঙুল ফুটিয়ে, গা ঝাঁকি দিয়ে চেকলিস্টে মনোযোগী হলাম। ইঞ্জিন চালু হওয়ার পর আবহাওয়া হালনাগাদ এবং ফ্লাইট রুট ক্লিয়ারেন্স নিলাম। গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে রানওয়েতে পৌঁছানোর ট্যাক্সিং নির্দেশ দেওয়া হলো। ‘বিফোর টেক–অফ চেক’ সম্পন্ন করে টাওয়ার কন্ট্রোলে জানালাম আমি টেক–অফের জন্য প্রস্তুত। রানওয়ে ক্লিয়ারেন্স পেলাম, ফাইনাল আইটেম চেক করে আমার প্লেন ছোটালাম। ঠিক যে মুহূর্তে আমার প্লেন মাটি ছেড়ে মেঘের পাড়ে রওনা হলো, সে মুহূর্তে আমার মনের সব অজানা ভয়, জড়তা আর দুশ্চিন্তাও উবে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার ফুট ওপরে উঠে গেলাম। এই ফ্লাইটের জন্য এমন উচ্চতা বাছাই করতে হয়েছে যেন মেঘের স্তরের নিচে থাকতে পারি। নতুন এবং অনভিজ্ঞ পাইলটেরা মেঘের ওপরে উঠে গেলে, চোখের ধাঁধা লাগতে পারে বলে এই নিয়ম। অবশ্য ট্রেনিংয়ের পরের ধাপগুলোতে শুধু ককপিটের ভেতরের যন্ত্রপাতির সাহায্যে নিরাপদে বিমান চালনা শেখানো হয়। সেই গল্প অন্য কোনো দিনের জন্য তোলা থাকল।

৬ হাজার ফুট ওপরে টুকরো টুকরো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। এমন মেঘের দিনে ছোট ছোট এয়ার পকেট তৈরি হয়। আমি সেই পকেটে ঢুকে পড়ছি আর মনে হচ্ছে বাতাসের দোলনায় দুলছি। আজকের ফ্লাইটে কোনো কসরতের প্রয়োজন নেই। সময়ে সময়ে কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করছি এবং দরকারি নির্দেশনা নিচ্ছি। ঝকঝকে রোদ, বিশাল আটলান্টিক, তার পাড় ধরে সারি সারি বাড়ি। একে একে কয়েকটি শহর ফেলে যাচ্ছি। উড়োজাহাজের গতিপ্রকৃতি আর উচ্চতা ধরে রাখার জন্য যথাযথ ইনপুট দিচ্ছি। হঠাৎ শুনছি কন্ট্রোল রুম একই আকাশসীমায় থাকা একটি উড়োজাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। আমার সঙ্গে তাদের অবস্থান বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি বলে সাময়িকভাবে ৬ হাজার ফুটে উঠে যেতে বলা হলো। মিনিটখানেকের মধ্যেই ৬০০ ফুট নিচ দিয়ে দুই ইঞ্জিনের ডাইমন প্লেন দেখতে পেলাম। তাদের গতি এবং ওজন বেশি হওয়ায় দমকা হাওয়া অনুভূত হলো। পরে জেনেছি, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। রিপোর্ট করলাম, ‘আই হেভ ক্লিয়ারড দ্য ট্রাফিক।’

উড়োজাহাজের ককপিটে লেখক
উড়োজাহাজের ককপিটে লেখক

এদিকে মেঘ কালো হয়ে আসছে, আমাকে আসন্ন তুফান এড়িয়ে ঘুরে যাওয়ার নতুন রুট দেওয়া হলো। এতে আমার লাভই হলো। কেনেডি স্পেস সেন্টারের খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। একটি রকেট উৎক্ষেপণের কাজ চলছিল দেখতে পেলাম। নিজেকে একটু ভাগ্যবান মনে হলো। ১৫ মিনিটের মধ্যে ভেরো বিচ রিজওনাল এয়ারপোর্ট পৌঁছে যাব। ডিসেন্ট চেক, ফাইনাল চেক শেষ করে ল্যান্ডিং ক্লিয়ারেনস পাওয়ার অপেক্ষা। আবহাওয়ার জন্য পথ ঘুরে যেতে ফ্লাইট প্ল্যানের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগল। এর মধ্যেই টাওয়ার থেকে সব প্লেন হোল্ডে যেতে বলা হলো। কারণ, কোনো একজন পাইলট ভুল রানওয়েতে অবতরণ করেছেন। সম্ভবত তাঁরও ক্রস কান্ট্রি ফ্লাইটের প্রথম দিন। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, যদি আমিও একই ভুল করে বসি! এই রকম ভুলের অফিশিয়াল খেসারত বিশাল। আরেকবার এয়ারপোর্টের নকশা, কম্পাসে হেডিং মিলিয়ে নিলাম।

ঠিকমতো নিরাপদে অবতরণ সম্পন্ন হলো, জ্বালানি নেওয়ার স্টেশনে পৌঁছালাম, তাঁদের হাতে প্রয়োজনীয় কাগজ আর চাবি দিয়ে লাউঞ্জে ছুটলাম। ফিরে এসে দেখি আমার পার্কিংয়ের জায়গায় একটা গলফিং কার! আস্ত একটা উড়োজাহাজ আমাকে ফেলেই উড়ে গেল! ততক্ষণে বিমানবন্দরের কর্মী বললেন, আমার উড়োজাহাজ পাশে নেওয়া হয়েছে। আমাকে নিতেই এই গলফ কার।

পাখির চোখে দেখা কোনো এক শহর
পাখির চোখে দেখা কোনো এক শহর

একই নিয়মে দ্বিতীয় টেক–অফ করলাম। ভেরো বিচ রিজওনাল এয়ারপোর্ট থেকে অরল্যান্ডো মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের পথ মাত্র ২০ মিনিটের। নিয়মের কাজকর্ম করতেই সময়টুকু দ্রুত চলে গেল। অরল্যান্ডো মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে পাশাপাশি দুটি রানওয়ে। আমি নামছি নাইন লেফটে আর নাইন রাইটে একটি বোয়িং ৭৩৭ নামছে, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে। অবতরণের পর সেই বড় পাখির পাইলট রেডিওতে অভিনন্দন জানালেন। মেলবোর্নে কফি পানের জন্য ৩০ মিনিট বিরতি নেওয়ার কথা থাকলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে তা ২ ঘণ্টা হয়ে গেল। অবশেষে মেঘ কাটল, ডেটোনা বিচের পথে রওনা হলাম। এই পথটুকু যাওয়ার সময়ই পার হয়েছেই, তাই রুট নিয়ে অস্থিরতা বা চিন্তা একটু আয়ত্তে। চটপট কিছু ছবি তুলে নিলাম।

হোম এয়ারপোর্টে ফিরলাম, আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের কাজ শেষ হতেই ফ্লাইট প্রশিক্ষক একটি উড়োজাহাজের রেপ্লিকা উপহার দিলেন। বললেন, এই দিনের কথা অনেক অনেক বছর আমার মনে গেঁথে থাকবে। হয়েছেও তা–ই। এরপর কত অনুশীলন উড়োজাহাজ নিয়ে ছুটেছি, কত একক ফ্লাইট গেল। কিন্তু প্রথম দিনের ডানা মেলে একাকী উড়ে বেড়ানোর মতো আবেগ, ভয় আর উচ্ছ্বাসের অনুভূতির কোনো তুলনা হয় না।

ককপিটে বসে তোলা ছবি
ককপিটে বসে তোলা ছবি