দূর পরবাস

প্রথম মসজিদ চালু হচ্ছে এথেন্সে

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
 গ্রিসে ২০০ বছর পর মসজিদ চালু হচ্ছে
গ্রিসে ২০০ বছর পর মসজিদ চালু হচ্ছে
ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই শতাব্দী পর গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম মসজিদের উদ্বোধন করা হচ্ছে। শুক্রবার জুমার নামাজের মধ্য দিয়ে এ মসজিদের কার্যক্রম শুরু হবে। তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো গ্রিসেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব ও কঠোর স্বাস্থ্যবিধির মধ্য দিয়ে আপাতত স্বল্পসংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতিতে এ মসজিদের কার্যক্রম শুরু করা হবে।

বলকান উপদ্বীপের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত ৫০ হাজার ৯৪৯ বর্গমাইল আয়তনের দেশ গ্রিস। উত্তরে আলবেনিয়া, মেসিডোনিয়া ও বুলগেরিয়া; পূর্বে তুরস্ক ও এজিয়ান সাগর; দক্ষিণে ক্রেতান ও লিবিয়ান সাগর এবং পশ্চিমে আইয়োনিয়ান সাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত দেশটি আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তিভূমি হিসেবে পরিচিত। পাশপয়াশি গ্রিস পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স খ্রিষ্টানিটির প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে সমাদৃত। সর্বশেষ ২০১৯ সালের জনগণনা অনুযায়ী দেশটিতে প্রায় এক কোটি মানুষ বসবাস করে, যাদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগের মতো মানুষ অর্থোডক্স খ্রিষ্টানিটির অনুসারী। অর্থোডক্স খ্রিষ্টানিটির পর দেশটির সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, যারা দেশটির মোট জনসংখ্যার দেড় শতাংশের মতো।

গ্রিসে বসবাসরত ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষের একটা বড় অংশ তুর্কি ও আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত। এ ছাড়া বেশ কিছুসংখ্যক গ্রিকভাষী মানুষ রয়েছে, যারা জন্মগতভাবে মুসলিম। গ্রিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত থ্রেস দেশটির সর্ববৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং গোটা ইউরোপের মধ্যে থ্রেসই একমাত্র অঞ্চল, যেখানে শরিয়াহ আইন চালু রয়েছে। ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লুজার্ন চুক্তির ফলে দেশটিতে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ মানুষকে তুরস্কে চলে যেতে হয়। তুরস্ক, তথা এশিয়ান মাইনর অঞ্চলে ববসাস করা খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মালম্বী মানুষদের গ্রিসে স্থানান্তর করা হয়। সত্তরের দশকের পর থেকে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই অভিবাসী হিসেবে গ্রিসে পাড়ি জমাচ্ছেন, যাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশের মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী।


মূলত তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে গ্রিসে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে। ১৮২১ সালে এথেন্সসহ বর্তমান গ্রিসের বেশ কিছু অঞ্চল অটোমান শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলনের ডাক দেয়। অবশেষে ১৮২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম হেলেনিক প্রজাতন্ত্র, যার রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত করা হয় এথেন্সকে।

 ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্য এথেন্স ছিল একমাত্র রাজধানী শহর, যেখানে সরকারিভাবে কোনো মসজিদ ছিল না
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্য এথেন্স ছিল একমাত্র রাজধানী শহর, যেখানে সরকারিভাবে কোনো মসজিদ ছিল না
ছবি: সংগৃহীত

১৮৩৩ সাল থেকে তদান্তীন হেলেনিক প্রজাতন্ত্রের সরকারের অর্থায়নে এথেন্সে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন এ অঞ্চলে বসবাস করা ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষেরা। এমনকি ১৮৯০ সালে সরকারিভাবে এথেন্সে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে দেশটির অতি ডানপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক জোটগুলোর তীব্র বিরোধিতা, বিভিন্ন ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থোডক্স চার্চগুলোর বাধা এবং আর্থিক অনটনের মধ্যে সুদীর্ঘকাল সেখানে মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি।

গ্রিসের সঙ্গে তুরস্কের রাজনৈতিক বৈরিতা দীর্ঘদিনের। এ কারণে গ্রিসের অনেক সাধারণ মানুষও এত দিন পর্যন্ত এথেন্সে মসজিদ নির্মাণের বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। তাদের অনেকের মতে, গ্রিসে নতুন করে কোনো মসজিদ নির্মাণ করার অর্থ পুনরায় দেশটিতে অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের পুনর্জাগরণ ঘটানো। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে এত দিন পর্যন্ত এথেন্স ছিল একমাত্র রাজধানী শহর, যেখানে সরকারিভাবে কোনো মসজিদ ছিল না।

গ্রিক সরকারের অর্থায়নে নির্মিত মসজিদটি তৈরি করতে আনুমানিক ৮ লাখ ৮৭ হাজার ইউরো খরচ হয়েছে। ২০১৬ সালে চূড়ান্তভাবে এ মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করা হয় এবং ২০১৭ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

গ্রিসের শিক্ষা ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কোস্তাস গাভ্রোগলু জানিয়েছেন, এ মসজিদে একসঙ্গে ৩৫০ জন নামাজ আদায় করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে এ মসজিদের নাম রাখা হয়েছে ভোতানিকোস মসজিদ। এথেন্সের হার্টখ্যাত সিনতাগমা স্কয়ার থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নৌবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত ঘাঁটির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে এ মসজিদ।


*লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া