দূর পরবাস

বাবার ঘ্রাণ

প্রকাশ: ৭ এপ্রিল ২০২১, ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

চোখের কোণে বেশ অশ্রু জমেছে। বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো সে কান্না এখন বেরিয়ে আসবে জানি। তার আগেই রুম ত্যাগ করতে হবে। অনেক দিন কাঁদি না, তাই কান্নার জেদ পেয়ে বসছে। পেছনে ফিরে দেখি আম্মা জায়নামাজ এক পাশে রেখে বাবার বিছানার পাশে এলেন। বাবার বালিশটা বুকে চেপে ধরলেন কিছুক্ষণ, তারপর পলাশের টেবিলে বাবার যত্নে রাখা দামি আতরটা সারা গায়ে মাখলেন আম্মা। যে আতরটা আমি দিয়েছিলাম। তারপর থেকে বাবা নামাজের আগে এই আতর গায়ে মাখতেন। আতরের তীব্র গন্ধ মুহূর্তে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। আজ অবশ্য এত ঝাঁজ লাগছে না আতরের। মনে হচ্ছে আব্বা এই রুমে আছেন।

আমি আস্তে আস্তে চোখ বুজে বাবার অস্তিত্ব কল্পনা করছি। বাবাকে দুদিন আগে সাদা কাফনে জড়িয়ে আসল ঠিকানায় রেখে এলাম। অথচ এখনো ঘরের প্রতিটি জায়গায় বাবার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। এত সহজে বাবার এ মায়া কাটবে না জানি। বাবাকে যখন নিয়ে যাচ্ছিলাম কাঁধে করে তখন মনে হচ্ছে, এ যাওয়াটাই শেষ, আর ফিরবেন না। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন এক পা দু পা করে। ইশ্‌ যদি আরেকবার ছুঁতে পেতাম। হয়নি আরেকবার বুকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদা। কিছুটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
আম্মার পরনে আজ সাদা শাড়ি, চোখে–মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির দাগ। অনেক দিন বাবার শিয়রে রাত জেগে থাকার ক্লান্তির ছাপ। মনে হচ্ছে কত বছর ঘুমাননি। আমি জানি আব্বার শূন্যতা আম্মাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। যে মানুষটি ছাড়া আম্মা কখনো একা ভাত খেতে যাননি, ঘুমাতে যাননি। সেই মানুষ ছাড়া কী করে দুটি দিন পার করে ফেললেন, সেটা একটা রহস্য। আমি জানি আম্মার চোখে অনেক জল। পাছে আমি দেখে ফেলি, সেই ভয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছেন না।

কত দিন বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেই স্পর্শ, সেই উম, সেই নিরাপদ আশ্রয়, সেই আঙুলে আঙুল জড়িয়ে শৈশবে একসঙ্গে ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটা মানুষটির একই রকম গায়ের গন্ধ এখন কোথাও নেই।  দুনিয়ার কোন পারফিউমে বাবার সে গন্ধ নেই। পৃথিবীর সব বাবাদের গায়ে একই রকম গন্ধ। সে গন্ধে মিশে থাকে একটা আজীবন আশ্রয়, অফুরন্ত নিখাদ ভালোবাসা। এই ভালোবাসার কাছে জগতের সব ভালোবাসা তুচ্ছ।

আজ বাবা নেই, বাবার সে কোল নেই, সেই উম, সেই গন্ধ, সেই ভালোবাসা কোনোটাই নেই। আমার চোখ ক্রমেই অন্ধকারে দিকে যাচ্ছে। দেহটা কেমন জানি অবশ হয়ে আসছে। বাবার সেই গন্ধ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বাবা কী তবে ঘর থেকে চলে গেছে।
চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকালাম। সে চোখে রাজ্যের জিজ্ঞাসা, কিন্তু নিশ্চুপ আম্মা। আমি কেবল ঘর থেকে বের হতে হতে বললাম, বাবা নিশ্চয়ই খুব ভালো আছে। অনেক ভালো আছে আম্মা।

*লেখক: কুয়েতপ্রবাসী