স্বাস্থ্য

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা। তাই এ সম্পর্কে সচেতন থাকার বিকল্প নেই। সচেতন থাকতে প্রথমেই প্রয়োজন নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ।

ডা. তানিয়া আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামান
ডা. তানিয়া আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামান

মানুষকে উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে সচেতন করতে ১৭ অক্টোবর বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালন করা হয়। এ উপলক্ষেই আয়োজন করা হয় এসকেএফ নিবেদিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ের সুরক্ষা’। দ্বিতীয় পর্বের প্রতিপাদ্য ছিল: আপনার রক্তচাপ জানুন, নিয়ন্ত্রণ করুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন। চিকিৎসক তানিয়া আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামান। অনুষ্ঠানটি ১৬ অক্টোবর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রচারিত হয় এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোন অবস্থায় বলা যাবে একজন ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তিনি জানান, সাধারণভাবে কারও রক্তচাপ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে তাহলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলে। কিন্তু কেউ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে তা বলার আগে বেশ কিছু বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। যেমন অন্তত এক সপ্তাহ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকবার রক্তচাপ মাপতে হবে। এরপর যদি দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেশি তবেই বলা যাবে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অবশ্যই বসে রক্তচাপ মাপা উচিত, শরীর ও মন শান্ত অবস্থায় থাকে এমন সময় বেছে নেওয়া উচিত। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রথমবার মাপাতেই রক্তচাপ অনেক বেশি, যাকে বলে ম্যালিগন্যান্ট হাইপারটেনশন। এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপের অনেক রোগী রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেন। এ বিষয়ে অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামান বলেন, ‘এমন ঘটনা আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। অনেক রোগীই ডাক্তারকে না জানিয়ে হঠাৎ ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেন; যা একেবারেই ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও থাকে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়। রোগী বলছেন রক্তচাপ বাড়তি থাকলেও আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, এমন অজুহাতে কেউ কেউ ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে চান। আসলে উচ্চ রক্তচাপে তেমন কোনো উপসর্গ না থাকলেও এটি ধীরে ধীরে হৃদ্‌রোগ, পক্ষাঘাত, দৃষ্টিহীনতা ও কিডনি বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদি এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়াতেই ওষুধ দেওয়া হয়।’

অনেকেই বলেন, “একবার ওষুধ শুরু করলে সারা জীবন খেতে হবে। তাই শুরু না করাই ভালো।” এ চিন্তাও বিপজ্জনক। যদি একবার নিশ্চিত হওয়া যায় কারও উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে। তাহলে তাকে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ শুরু করতে হবে। না হলে জটিলতা বাড়বে।’

অনুষ্ঠান চলাকালে দর্শকেরাও উচ্চ রক্তচাপ–সম্পর্কিত নানা বিষয়ে জানতে চান। এ সময় বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামান। এর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন জীবনযাপন পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণে। তাঁর মতে, ‘উচ্চ রক্তচাপের অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ইত্যাদি। তবে অনেকই ভাবেন কেবল মানসিক উৎকণ্ঠা উচ্চ রক্তচাপের একমাত্র কারণ। এ ধরণাটিও ভুল।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, মদ্যপান, তেল-চর্বিজাতীয় খাবার, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনাচরণ পরিবর্তন করে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর ওষুধ সেবনের বেলায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আমাদের দেশের অনেকেই ফার্মেসিতে গিয়ে দোকানির কাছ থেকে অথবা নিজের ইচ্ছেমতো ওধুষ কিনে খেয়ে থাকেন। যেকোনো অসুখের ক্ষেত্রেই এটি বিপজ্জনক।’

তবে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। কেননা একজন ডাক্তার ওষুধ দেওয়ার আগে অনেকগুলো বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নেন। যেমন উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে রোগীর বয়স, ওজন, উচ্চ রক্তচাপের তীব্রতা, উপসর্গ ইত্যাদি। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক অন্যান্য রোগের জন্যও ওষুধের ধরন পরিবর্তন হয়, যেমন ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস, হাঁপানি, প্রোস্টেটের সমস্যা, গর্ভাবস্থা ইত্যাদি অনেক বিষয় বিবেচনা করেই রক্তচাপ কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়।

দেখা যায় কোনো ওষুধ কারও জন্য উপকারী, আবার একই ওষুধ অন্য কারও জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই যে ওষুধে একজনের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেটা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আপনি খাওয়ার চিন্তাও করবেন না।