স্বাস্থ্য

যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসায় সম্ভব ক্যানসার নিরাময়

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২:২৭ অপরাহ্ণ
ডা. ফাইজা রাহলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জাফর মো. মাসুদ
ডা. ফাইজা রাহলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জাফর মো. মাসুদ

বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হয়ে ফিরে আসার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা করে ক্যানসার নিরাময় করা সম্ভব। তবে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে এই রোগের চিকিৎসা হয়, তাতে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হলো বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের সহযোগিতায় আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল: ক্যানসার চিকিৎসায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পূর্বসতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা।

ডা. ফাইজা রাহলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি ও অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জাফর মো. মাসুদ। অনুষ্ঠানটি ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।

প্রথমে ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানা গেল, ক্যানসারের তিনটি চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে। তিনটি পদ্ধতির একটি হলো সার্জারি এবং এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না বললেই চলে। আর অন্য দুটি পদ্ধতি হলো কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। এর ভেতর রেডিওথেরাপিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পরিমাণ কম। যেমন কারও যদি মুখগহ্বরে ক্যানসার হয়, তাহলে রেডিয়েশনের প্রতিক্রিয়াটি কেবল মুখের ভেতর বা আশপাশেই দেখা যাবে। অন্যদিকে কেমোথেরাপিতে পুরো শরীরেই নানা রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ জন্য বেশির ভাগ রোগী কেমোথেরাপির কথা শুনলে বেশ আতঙ্কিত হন। অনেকেই কেমোথেরাপির বিকল্প হিসেবে কোনো ওষুধ সেবন করতে পারবেন কি না, এ ব্যাপারে চিকিৎসকের কাছে জানতে চান।

আমাদের দেশে শিক্ষিত সমাজের মোটামুটি সবাই যাঁরা ক্যানসার চিকিৎসা সম্পর্কে জানেন, তারা কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও অবগত। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মাত্রাটি নির্ভর করে কেমোথেরাপি কে কীভাবে দিল, তার ওপর। ডা. জাফর মো. মাসুদ এ ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁর আলোচনা থেকে জানা যায়, বাইরের দেশে কেমোথেরাপি দেওয়ার কাজটি করে অনকোলজি বা ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্টরা। আমাদের দেশে কেবল ন্যাশনাল ক্যানসার হাসপাতালে কিছুসংখ্যক অনকোলজি ফার্মাসিস্ট আছেন, আর কোথাও নেই। এ দেশের বেশির ভাগ হাসপাতালে নার্স বা মেডিকেল অফিসাররা কেমোথেরাপির ড্রাগ প্রিপারেশন করে থাকেন। এই ড্রাগ প্রিপারেশনের ওপর নির্ভর করে কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও কার্যকারিতা।

কেমোথেরাপির ড্রাগ কতটুকু তাপমাত্রায় রাখতে হবে, কী পরিমাণে দিতে হবে, এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে। এ ছাড়া কোন ব্যাগে ড্রাগটি দেওয়া হচ্ছে, কোন সুচ ব্যবহার করা হচ্ছে, এসব দিকে বিশেষভাবে খেয়াল করতে হবে। যেমন অনেক থেরাপি দেওয়া হয় সাধারণ স্যালাইন ব্যাগে, এতে করে ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেড়ে যেতে পারে এবং কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এ জন্য কেমোথেরাপি দিতে নন ডিইএইচপি বোতল ব্যবহার করতে হবে। আবার যে নিডল বা সুচ ব্যবহার করা হয় থেরাপি দিতে, তাতে যদি অ্যালুমিনিয়াম থেকে থাকে, তাহলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ ছাড়া সময় মেনে থেরাপি দিতে ইনফিউশন পাম্প ব্যবহার করতে হবে। কারণ নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে কম বা বেশি সময় ধরে থেরাপি দেওয়া হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া যেখানে থেরাপি দেওয়া হয় অর্থাৎ অ্যাম্বুলেটরি ট্রিটমেন্ট রুম বা ডে কেয়ার সেন্টারের সুরক্ষাব্যবস্থা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকাংশে নির্ভর করে। এসবের কোনো কিছুতে ত্রুটি থাকলে রোগীর শরীরে ইনফেকশন পর্যন্ত হতে পারে।

রেডিওথেরাপি দেয়ার প্রস্তুতি
রেডিওথেরাপি দেয়ার প্রস্তুতি
ছবি: রোডা বেয়ার, উইকিপিডিয়া

অন্যদিকে, যাঁরা কেমোথেরাপি দিয়ে থাকেন বা এর ড্রাগ প্রিপারেশন করে থাকেন, তাঁদের নিরাপত্তার কথাও মাথায় রাখতে হবে। কারণ কেমোথেরাপির ড্রাগ একটি তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক পদার্থ। এই সাইটোটক্সিন ড্রাগের প্রিপারেশন অবশ্যই বায়োলজিক্যাল সেফটি কেবিনে পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট বা পিপিই পরে করতে হবে। কারণ রাসায়নিক পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা শরীরে লেগে যিনি ড্রাগ প্রিপারেশন করছেন, তিনি সংক্রমিত হতে পারেন এবং তাঁর মাধ্যমে রোগী বা তাঁর আশপাশের মানুষও সংক্রমিত হতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশে কেমোথেরাপি দেওয়ার সময় এত সতর্কতা অবলম্বন করা হয় না বললেই চলে। এ জন্য এখানে কেমোথেরাপির রোগীর অনেক রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কারণ কেমোথেরাপির ড্রাগ প্রিপারেশন এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনা একজন অনকোলজি ফার্মাসিস্টই খুব ভালোভাবে করতে পারেন, অন্য কেউ নন। এ জন্য অনকোলজি ফার্মাসিস্টদের সেক্টর দ্রুততার সঙ্গে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
ছবি: পেকজেলসডটকম

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেসব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ক্যানসারের ওষুধ ও কেমোথেরাপির ড্রাগ তৈরি ও সরবরাহ করে থাকে, তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের দেশে তারা কেবল ওষুধের প্রচারণাই করে থাকে। তারা যদি এর বাইরেও অন্য ফার্মাসিস্টদের কেমোথেরাপি সম্পর্কে ট্রেনিং দিতে পারে, তাহলে এ দেশেও দক্ষ অনকোলজি ফার্মাসিস্টদের একটি আলাদা সেক্টর গড়ে ওঠা সম্ভব।
এ দেশের ক্যানসার চিকিৎসার উন্নয়নের জন্য সঠিক জাতীয় নীতি নির্ধারণ ও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও এই অনুষ্ঠানে আলোচনা করা হয়।

ডা. জাফর মো. মাসুদের মতে, বাংলাদেশে ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করলে এর চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে। অন্যদিকে ডা. স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় নীতিনির্ধারণের সময় অবশ্যই ক্যানসার রেজিস্ট্রেশনে অনলাইনে ডেটা সংগ্রহের প্রতি বিশেষ জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। কারণ তিনি বলেন, এর অভাবে আমাদের দেশে কত মানুষ ক্যানসার আক্রান্ত, বছরে কত মানুষ এ রোগে মারা যাচ্ছে, তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য সরকার, ক্যানসার হাসপাতাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে।