স্বাস্থ্য

স্বাভাবিক যাপনে যত্ন হৃদ-স্বাস্থ্যের

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো প্রতিবছর বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান এসকেএফ নিবেদিত ‘হৃদয়ের সুরক্ষা’র প্রথম পর্ব—হৃদয়ের সুরক্ষা হোক হৃদয় থেকে।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী এবং হেলদি হার্ট হ্যাপি লাইফ অর্গানাইজেশনের (হেলো) প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও উপদেষ্টা ডা. মহসীন আহমেদ। সঞ্চালনায় ছিলেন ডা. ফাইজা রাহলা। অনুষ্ঠানটি ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং এসকেএফের ফেসবুক পেজ থেকে একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

প্রথমে জানা গেল বিশ্ব হার্ট দিবস পালনের উদ্দেশ্য ও এর তাৎপর্য। বর্তমান বিশ্বের ১ নম্বর ঘাতক ব্যাধি হলো হৃদ্‌রোগ। প্রতিবছর প্রায় ১৮ মিলিয়ন, অর্থাৎ ৩১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে। হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর নতুন নতুন থিম নিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—ইউজ হার্ট টু বিট কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, অর্থাৎ হৃদয় দিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ।

ডা. ফাইজা রাহলার সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী ও ডা. মহসীন আহমেদ
ডা. ফাইজা রাহলার সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী ও ডা. মহসীন আহমেদ

বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের মূল উদ্দেশ্য হলো, ২০২৫ সালের মধ্যে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা। আর এ জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হৃদরোগ প্রতিরোধ। শুধু প্রতিকার করেই এ মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ, যে পরিমাণ মানুষ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে মারা যাচ্ছে, তার ৮০ শতাংশ হলো নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের জনগণ। হৃদরোগের চিকিৎসা করার মতো ক্ষমতা অনেকের নেই। এ জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন ও সহানুভূতিশীল হতে হবে। শুধু নিজে সচেতন হলে হবে না, আশপাশের মানুষদের সচেতন করতে হবে। নিজের হার্টের যেমন যত্ন নিতে হবে, তেমনি অন্যের হার্টেরও যত্ন নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হৃদরোগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা দুঃখের সঙ্গেই জানালেন যে আমাদের দেশে প্রতিবছর হৃদরোগে কত মানুষ মারা যাচ্ছে, সেটা জানার জন্য সঠিক কোনো তথ্য নেই। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ দেশে মৃত্যুর আগে খুব কমসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে যায়। এ ছাড়া হার্ট অ্যাটাক হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাসপাতালে যাওয়ার আগে রোগী মারা যায়। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব দেশেই এটি দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে হৃদরোগে মৃত্যুর হার সারা বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি হবে। কারণ, ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোয় মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয় ৬০ বছরের পর। আর আমাদের দেশে ২০ বছর বয়সের পর থেকে শুরু হয়। ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের ভেতর হৃদরোগের সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবেই বেড়ে চলেছে। এ ছাড়া এখানে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু ও নারী রোগী অনেক দেখা যায়।

হৃদরোগ বলতে আমরা অনেকে হার্ট অ্যাটাককে মনে করি। হৃদরোগ শুধু হার্ট অ্যাটাক নয়। হার্টের আরও অনেক রকম সমস্যা হতে পারে। যেমন প্রেশারজনিত সমস্যা, হার্টের ভাল্বের ত্রুটি, হার্টের ব্লক, ছিদ্র ইত্যাদি।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
ছবি: পেকজেলসডটকম

আমাদের দেশে যুবসমাজ ও শিশু–কিশোরদের ভেতর হৃদরোগে আক্রান্তের হার বেড়েই চলেছে। এ জন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করেছেন অনিয়ন্ত্রিত জীবন ব্যবস্থাপনাকে। এ দেশে শিশু-কিশোরেরা এখন শারীরিক কাজ, খেলাধুলা অনেক কম করে। তাদের বেশির ভাগ সময় কেটে যায় পড়াশোনায় আর স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে গেমস খেলে। অন্যদিকে এদের ভেতর ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রবণতা বেশি। ফলে অল্প বয়সে মুটিয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে সফল হতে সারা দিন লাগিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, নিজের দিকে খেয়াল রাখছে না। ঠিকমতো খাচ্ছে না, ব্যায়াম করছে না। আবার সফল হতে না পারলে খুব সহজে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে। এসব কিছুই কিন্তু সবাইকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে একটা দিকেই, আর সেটি হলো হৃদরোগ।

স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হার্ট সুস্থ রাখাই বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল প্রচারণা। এ জন্য নিজের হার্টের যত্ন নিতে হবে। হৃদ-স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞরা তাই সবার প্রথমে জীবনযাপনের পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। খুব বেশি নয়, অল্প কিছু দিকে খেয়াল রাখলেই আমরা বিভিন্ন রকমের হৃদরোগ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারি। যেমন নিয়ম করে প্রতিদিন ৪০ মিনিট করে হাঁটতে হবে। ধূমপান থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে হবে এবং ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলতে হবে।

ফাস্ট ফুডের ট্রান্সফ্যাট শরীরে চর্বি জমার জন্য দায়ী। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি হৃদরোগের একটি বড় প্রভাবক। কেউ যদি ফাস্টফুড একেবারেই ছাড়তে না পারে, সে ক্ষেত্রে নিজের সুস্থতার খাতিরে অবশ্যই তাকে তার পরিমাণ কমাতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের খাবার থেকে প্রাপ্ত চর্বি পোড়ানোর জন্য হাঁটতে হবে অথবা ব্যায়াম করতেই হবে। এ ছাড়া কমাতে হবে ভাতের ওপর নির্ভরশীলতা।

হৃদরোগের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ফাস্টফুড
হৃদরোগের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ফাস্টফুড
ছবি: পেকজেলসডটকম

অনেকেই বলে যে তারা কাজের চাপের জন্য নাকি হাঁটার সময় পায় না। সুস্থ থাকতে হলে যেভাবেই হোক দিনের যেকোনো একটা সময় বেছে নিয়ে হাঁটতেই হবে। একটানা ৪০ মিনিট না পারলেও দিনে চারবার ১০ মিনিট করে হাঁটলেও সেটি শরীরের জন্য যথেষ্ট বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু হৃদরোগ নয়, অন্য যেকোনো রকমের বড় রোগ থেকে বাঁচতে সুস্থ জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই। আর এই যাপনের সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে ছোটবেলা থেকে। ছোট থাকতেই যারা সোফায় বসে ‘কাউচ পটেটো’ হয়, বড় হয়ে তাদের ভেতরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। তাই অভিভাবকদের শুধু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার দিকেই নয়, নজর রাখতে হবে স্বাস্থ্যের দিকেও। তাদের শারীরিক কাজ ও খেলাধুলার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে, খেলাধুলা করার সুযোগ করে দিতে হবে। এ জন্য সরকারকেও এগিয়ে আসতে। পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ বানানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া হৃদরোগ প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচারণা বাড়াতে হবে। আর এভাবেই আমরা পেতে পারি হৃদরোগবিহীন সুস্থ একটি সমাজ।