মতামত

‘ব্যারিস্টার মিজান সাহেব কি আছেন?’

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারী ২০২১, ১:১৯ অপরাহ্ণ
মিজানুর রহমান খান (১৯৬৭–২০২১)
মিজানুর রহমান খান (১৯৬৭–২০২১)
ছবি: খালেদ সরকার

আমাদের প্রিয় সহকর্মী মিজান আজ নেই। কিন্তু সাংবাদিক, লেখক, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি রেখে গেলেন আমাদের নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য। একদিকে শুধু প্রিন্ট ও অনলাইন সাংবাদিকতাই নয়, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম, বিশেষভাবে টক শো মাতিয়ে রাখতেন তিনি।

সাংবাদিক পরিচয়ের পাশাপাশি অনেক পাঠকের কাছে তাঁর আরেকটি পরিচিতি ছিল। আমি সেটা জানতে পারি একটা ঘটনায়। একদিন অফিসে ঢুকছি, দেখি একজন ব্যক্তি অভ্যর্থনা কাউন্টারের কর্মীর সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি বলছেন, ‘ব্যারিস্টার মিজান সাহেব কি আছেন? তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ আমি একটু দ্বিধায় পড়লাম। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি মিজানুর রহমান খানের কাছে এসেছেন, প্রথম আলোর সাংবাদিক? তিনি সাগ্রহে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাঁকেই চাই, তিনি কাল যে মামলার জামিনের বিষয়টি পরিষ্কার করে লিখেছেন...।’

আমি বললাম, আসেন আমার সঙ্গে। তারপর সহকর্মী মিজানের কাছে তাঁকে পৌঁছে দিলাম। মিজান তো হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা করে সাংবাদিকতায় এসেছেন। কিন্তু তাঁর লেখায় আইন-বিচার-আদালত প্রভৃতি বিষয় প্রায়ই থাকত এবং ১৮৭৮ সালে কোন আদালতে অমুক বনাম অমুকের মামলার রায়ে কোন জজ সাহেব ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন এবং পরে কোন কোন মামলায় সেই আলোকে রায় হয়েছে, এই সব তথ্য তিনি নিখুঁতভাবে তুলে ধরতেন। তাই অনেক পাঠক ভাবতেন, তিনি নিশ্চয়ই একজন ব্যারিস্টার। তা না হলে তো এত কিছু মুখস্থ থাকার কথা নয়!

মিজানের বহুমুখী প্রতিভার খবর যখন অনেকের কাছেই পরিষ্কার ছিল না, তখন আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমান একটু আঁচ করতে পারেন। একদিন তিনি আমাকে বলেন, মিজানুর রহমানের লেখগুলো তো বেশ ভালো। প্রাসঙ্গিক ঘটনাগুলো তীক্ষ্ণভাবে লেখে। আমাদের পত্রিকায় তাঁকে দরকার। আমি তখন সম্পাদকীয় বিভাগের দায়িত্বে। মিজানের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ছিল না। তিনি তখন অন্য একটি পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর লেখাগুলো আমাকে টানত। মিজানের কথা শুনে আমি তো মহা খুশি। কারণ, আমাদের তখন ধারালো লেখার সাংবাদিক দরকার। এইভাবে মিজান এলেন।

মিজানের কাছ থেকে আমি একটা নতুন বিষয় শিখলাম। সেটা হলো লেখার স্থান-কাল-পাত্র। একদিন আমাদের একটি জরুরি বিষয়ে সম্পাদকীয় লেখার প্রয়োজন ছিল। আদালতের একটি মামলার বিষয়ে। আইন-আদালত মানেই তো মিজান। কিন্তু মিজান তখনো অফিসে আসেননি। তাঁকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, হঠাৎ জরুরি প্রয়োজনে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। তিনি তখন বাসে। বললাম, একটা সম্পাদকীয় লেখার দরকার ছিল...। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘কী বিষয়ে? আমি এখনই লিখে পাঠাচ্ছি।’ বললাম তাঁকে। আর আমি নিজেও প্রস্তুতি নিলাম। কারণ, লেখাটা জরুরি ছিল। কিন্তু দরকার হলো না। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে মিজানের লেখা সম্পাদকীয়টা মেইলে এসে গেল। আমি তো হতবাক! একটা সম্পাদকীয় লেখা তো যে-সে কথা নয়। কত কিছু পড়ে, বিশেষজ্ঞ কারও সঙ্গে কথা বলে, বিষয়টা আত্মস্থ করে, তারপর কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে মনে মনে সাজিয়ে লিখতে হয়। মিজান বাসে চলতে চলতেই এই সব কিছু করে ফেলেছেন। ল্যাপটপ সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকত। ইন্টারনেটে ওই বিষয়ের যাবতীয় খবরাখবর জেনে নিলেন। দু-একজনের সঙ্গে কথাও বলে নিলেন। গেল ২০ মিনিট। তারপর ১০ মিনিটে ৪০০-৫০০ শব্দের সম্পাদকীয় লিখে মেইল করে দিলেন।

আর আমি ওদিকে ডেস্কে বসে পত্রপত্রিকা ঘাঁটছি, দু-একজনের সঙ্গে কথাও বললাম। তারপর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এর মধ্যেই মিজান ভাইয়ের লেখা এসে গেল। সেদিন আমার চোখ খুলে গেল। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এসে গেছে বলে পত্রপত্রিকায় তখনো কিন্তু লেখালেখি শুরু হয়নি। কিন্তু প্রায় দেড় যুগ আগেই মিজান চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রথম আলোয় শুরু করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে একজন সিনিয়র গবেষক একসঙ্গে তিন-চারটি কাজ করেন। গবেষণাগারে কোনো পরীক্ষার রিডিং নিচ্ছেন, তাঁর ফাইভ-জি মোবাইল স্ক্রিন প্যাডে রিডিং লিখে রাখছেন, একই সঙ্গে জরুরি মেসেজের উত্তর সেই মোবাইলেই টেক্সট করছেন, আবার ফাঁকে ফাঁকে গুগল সার্চ করে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিচ্ছেন।
মিজানের কাজের স্টাইলটাই ছিল একেবারে ভিন্ন। কোনো স্থির টেবিল-চেয়ার নয়। দিন-রাত নেই। রাস্তায় চলতে চলতেই চায়ের দোকানে বসে গেলেন। জরুরি কোনো ‘ব্রেকিং নিউজ’ লিখে অফিসে পাঠিয়ে দিলেন। পরে সন্ধ্যায় এসে সেই ‘ব্রেকিং নিউজটা’ সেদিন যাচ্ছে কি না, তার খোঁজখবর করছেন। রাত ১১-১২টা পর্যন্ত সেই রিপোর্ট ছাপানোর প্রয়োজনীয়তা নিউজ এডিটরকে বোঝাচ্ছেন।

আমরা মিজানকে শুধু হারাইনি, হারিয়েছি বর্তমান বিশ্বের প্রিন্ট-ডিজিটাল সাংবাদিকতার কলাকৌশলে চৌকস একজন গুণী ব্যক্তিকে।

মাস দেড়েক আগে তাঁর জ্বর-কাশি হয়েছিল। আমরা আশঙ্কা করেছিলাম করোনা কি না। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেল নেগেটিভ। আমরা আশ্বস্ত হলাম। সেদিন তাঁকে বলেছিলাম, মিজান ভাই, অলওয়েজ স্টে পজিটিভ বাট টেস্ট নেগেটিভ। পরদিন অফিসে দেখি তিনি ও আরেকজন সহকর্মী দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। আমাকে সাগ্রহে আমন্ত্রণ জানিয়ে বললেন, ‘এই যে আসুন, আমি টেস্টে নেগেটিভ, কিন্তু নিজে ইলিশ মাছ রেঁধে এনেছি, আসুন একসঙ্গে খাই।’ একেবারে মনখোলা একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘বি পজিটিভ!’

মিজান সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। কোনো দিন কোনো কাজ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার মন-কষাকষি হয়নি। এটাই আমার সান্ত্বনা।


আব্দুল কাইয়ুম প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক।