কলাম

কৌশল এবং ষড়যন্ত্র মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

প্রকাশ: ২৩ েব্রুয়ারি ২০২১, ৬:০ পূর্বাহ্ণ
কৌশল এবং ষড়যন্ত্র মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

দুই সপ্তাহজুড়ে বৈঠকি আড্ডা থেকে টেলিভিশনের টক শো সয়লাব করে দিয়েছে ‘আল-জাজিরা’। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কয়টি টিভি বা ইউটিউব চ্যানেল, তার সংখ্যা সম্ভবত কেউ বলতে পারবেন না। সব কটির নাম বলতে পারলে তো তাঁকে আইনস্টাইনকেও ছাড়িয়ে যেতে হবে। কিন্তু আল-জাজিরা নামটি দেশের কোনাকানচায় চলে গেছে বিনা বিজ্ঞাপনে। মনে হয়, চ্যানেলটি একটা বড়সড় বোমা ফাটিয়েছে আর তার প্রচণ্ড শব্দ কাঁপিয়ে দিয়েছে চারদিক।

আমার বাসায় সুলতানি আমলের একটা কেব্‌ল লাইন আছে। তাতে আল-জাজিরা দেখানো হয় না। অনেকেই এটা দেখেছেন। ইউটিউব আর ফেসবুকের কল্যাণে এটা ছড়িয়েছে সব জায়গায়। আমাদের ভোকাবুলারিতে নতুন সংযোজন হওয়া শব্দ হলো ‘ভাইরাল’। উল্লিখিত ‘তথ্যচিত্র’টি ভাইরাল হয়েছে। এটাতে কেউ রাজনীতির নতুন পুঁজি খুঁজে পেয়েছেন, কারও নাকে লেগেছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ, আবার অনেকের জন্য এটা ছিল বিনোদন।

বিবিসি বাংলা আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, এ ব্যাপারে সরকার বিব্রত কি না। আমার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ছিল, সরকার অতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সরকারবিরোধীরা এ সুযোগে নানান কথা বলেছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার-সমর্থকেরা এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে জবাব দিতে গিয়ে কিঞ্চিৎ বেসামাল মনে হয়েছে। বোঝা যায়, প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে সমন্বয় ছিল না এবং যথেষ্ট হোমওয়ার্কও করা হয়নি।

আল-জাজিরায় প্রচারিত তথ্যচিত্রটির বিষয়বস্তু নিয়ে আমি এখানে কিছু বলব না। আমাদের সরকারপক্ষ বলছে, এর পেছনে খারাপ মতলব আছে। এটা বাংলাদেশবিরোধী একটি ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে, এটা অনেকেরই সহ্য হচ্ছে না। গত কয়েক দিন, বিশেষ করে প্রথম আলোয় পরপর তিন দিন ছাপা হওয়া মতামত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটা পরিষ্কার বোঝা যায়, আলোচিত তথ্যচিত্রটি এ দেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও উসকে দিয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। এ রকম অভিযোগ উঠলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, তা-ও শুনতে শুনতে আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। এটা তো অস্বীকার করার জো নেই যে দেশে মোটা দাগে এখন দুটি পক্ষ—একটি হলো এস্টাবলিস্টমেন্ট বা সরকারপক্ষ, অন্যটি এস্টাবলিস্টমেন্টবিরোধী পক্ষ। সরকারপক্ষ অবশ্য সব অভিযোগকারীকেই ‘বিএনপি’ হিসেবে ব্র্যাকেটবন্দী করে ফেলে। এটা অভ্যাস না ফোবিয়া, তা বলা মুশকিল।

এর আগে আমরা দেখেছি, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে দুর্নীতি নিয়ে টিআইবি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্বাহী প্রধান, মন্ত্রী ও সরকারপক্ষ একটি জবাবই দিয়েছে, ‘আমরা এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করলাম।’ সরকারপক্ষের কিছু সুশীল টিআইবি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে থাকেন, স্যাম্পল সাইজ তো খুব ছোট কিংবা মানুষের ‘পারসেপশন’ নিয়ে তো ঢালাও মন্তব্য করা যায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি একাধিক মন্ত্রীকে বলতে শুনেছি, টিআইবি কোথা থেকে টাকা পায়, তাদের এ ধরনের জরিপ করার অনুমতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এই বিজ্ঞ মন্ত্রীদের কথা শুনে হাসি পায়। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিকেরা জানেন, টিআইবিসহ সব এনজিওর সব প্রকল্পের জন্য এনজিও ব্যুরো থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। তা না হলে কোনো অনুদানের টাকা ব্যাংক থেকে তোলা যায় না।

তাদের আবেদনপত্রে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হয় এটা কী ধরনের প্রকল্প, কত টাকা খরচ হবে, কে বা কারা অনুদান দিচ্ছে, প্রকল্পের মেয়াদ কত দিন প্রভৃতি। প্রতিবছর এনজিও ব্যুরো থেকে তাদের নিবন্ধন নবায়ন করতে হয়। এর বরখেলাপ হলে এনজিওর নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। সরকার চাইলেই যেকোনো এনজিওকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করে বিদেশ থেকে টাকা আনা বন্ধ করে দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে।

যে কথা বলছিলাম, দেশে দুটি পক্ষ। দুই পক্ষের চিন্তা দুই মেরুর। এদের মধ্যে মিলমিশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখি না। এর মধ্যে পড়ে নাগরিক সমাজ খাবি খায়। এখানে নিরপেক্ষ হওয়ার মতো স্পেস পাওয়া দুঃসাধ্য। আপনি একটি পক্ষের সঙ্গে না থাকলে তারা আপনাকে প্রতিপক্ষের লোক হিসেবে প্রচার করবে। নাইন-ইলেভেনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের হুংকারটি মনে পড়ে যায়, ‘আইদার ইউ আর উইথ আস, অর উইথ দ্য এনিমি।’

এক-এগারোর পর এ দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি যে বদলে গেছে, এটা যে আর আগের মতো নেই, এটা অনেকেই বুঝতে চান না। সভা-মিছিল, ব্যানার-পোস্টার, স্লোগান-ম্যানিফেস্টো এখন আর কাজে দেয় না। এখন অন্য রকম কৌশলের যুগ।

কেউ কেউ চান বাংলাদেশে আল-জাজিরার সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হোক। সরকারের নির্বাহী আদেশে এটা সহজেই করা যায়। কয়েকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমের প্রকাশনা ও সম্প্রচার ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আল-জাজিরা প্রসঙ্গে একজন মন্ত্রী বলেছেন, সরকার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এটা তো খুব আশার কথা।

প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা এত উন্নয়ন করছি, তারপরও কিছু লোক আমাদের বিরোধিতা করে। এরা আসলে উন্নয়ন চায় না।’ এটা তো ঠিক যে দেশে অনেক কিছু হচ্ছে। অনেক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, যার আর্থসামাজিক অভিঘাত হবে খুবই ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী। এগুলো দৃশ্যমান। তবে সরকারপক্ষ যেটা বলতে চাইছে, তা হলো উন্নয়নের এ অভিযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে শেখ হাসিনার সরকারের বিকল্প নেই। এ কথাটা সরকারবিরোধী রাজনীতিবিদেরা মানতে চান না। কেননা ‘বিকল্প’ না থাকলে তাঁরা যাবেন কোথায়? কোনো বিরোধী শক্তি অতীতে সরকারে থাকা অবস্থায় এবং ভবিষ্যতে সরকারে গেলে একই সুরে গেয়েছে এবং গাইবে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

সরকার বহুমাত্রিক উন্নয়নযজ্ঞে নিয়োজিত। ঢাকা ও এর আশপাশের মাটি খুঁড়ে তৈরি হবে মেট্রোরেলের ছয়টি রুট। পুরো প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩৬ সাল। এ তো গেল মাত্র একটি প্রকল্পের কথা। বিরোধী নেতারা কি তত দিন বসে থাকবেন? তাঁদের তো বয়স হয়েছে?

উন্নয়নের একটা বড় শর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এখানে এর অর্থ করা হয়, সরকারের ধারাবাহিকতা। বিরোধীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় থেকে যেতে চাইছে। এ জন্য ভোট চুরি, মধ্যরাতের ভোট, এ ধরনের শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে। একদল বলছে, ক্ষমতাসীন দলের কৌশলের কাছে বিরোধীরা হেরে গেছে। অন্য দল বলছে, ক্ষমতাসীন দল ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়েছে।

‘কৌশল’ এবং ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দ দুটি দুই রকম মনে হলেও আসলে এদের মধ্যে কার্যত কোনো ফারাক নেই। এক পক্ষের কাছে যা কৌশল, অন্য পক্ষের কাছে তা ষড়যন্ত্র। এ খেলা চলছে, চলবে। নতুন নতুন কৌশলের উদ্ভাবন হবে। যাঁদের উদ্ভাবনী শক্তি বেশি, তাঁরাই টিকে থাকবেন। যাঁরা অক্ষম, তাঁরা শুধুই আস্ফালন করবেন।

বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে দুটি বড় ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কৌশল-ষড়যন্ত্র রাজনীতির ব্যাকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। একটি হলো ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত পালাবদল, অন্যটি হলো ২০০৭ সালের রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান, যা এক-এগারো নামে পরিচিতি পেয়েছে।

এক-এগারোর পর এ দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি যে বদলে গেছে, এটা যে আর আগের মতো নেই, এটা অনেকেই বুঝতে চান না। সভা-মিছিল, ব্যানার-পোস্টার, স্লোগান-ম্যানিফেস্টো এখন আর কাজে দেয় না। এখন অন্য রকম কৌশলের যুগ।

প্রচারও একটা কৌশল। সরকারের প্রেসনোট বা ক্রোড়পত্র কখনোই জনপ্রিয় ছিল না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় পুলিশের দেওয়া প্রেসনোটের ভাষা এখনো অবিকল আছে। এর বিপরীতে আল-জাজিরায় যা সম্প্রচার করা হয়েছে, তা ছিল সরকারপক্ষের জন্য একটা বড় ধাক্কা। ধাক্কাটা তারা সামলে উঠেছে।


মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

mohi2005@gmail.com