সাক্ষাৎকার

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাজে বড় বাধা দুর্নীতি

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০, ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম
প্রথম আলো

প্রথম আলো: দায়িত্বকালের ছয় মাসের মধ্যে দুই মাস পার হয়েছে। প্রশাসক হিসেবে অভিজ্ঞতা কেমন?

খোরশেদ আলম: আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ইচ্ছা থাকলে অনেক কাজ করা যায়। আইনের সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের দ্বন্দ্ব রয়েছে। তারপরও একজন মেয়র বা প্রশাসক যদি ইচ্ছা করেন, তিনি যদি একটু রাস্তায় নামেন, একটু কান পেতে মানুষের কথা শোনেন, তাহলে অনেক কাজ করা সম্ভব।

আপনি সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতির অজগর সাপ বলছেন। কেন অজগর সাপ মনে হলো?

খোরশেদ আলম: এটা শুধু এখানে না, সারা দেশেই এ অবস্থা আছে। আমার এখানেও কিছু দুর্নীতিবাজ লোক আছে। আমি চাচ্ছি ধাক্কা দিয়ে কর্মদক্ষতা বাড়াতে। আমি কিছুটা সফল হয়েছি কি না, আপনারা দেখেন। আগে রাস্তাঘাটে পরিচ্ছন্নতা বিভাগের এত লোক দেখেছেন? সিটি করপোরেশনের কাজে দুর্নীতি একটা বাধা। এখানে অনেকের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান করছে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণ পাচ্ছি না ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

আ জ ম নাছির বিলবোর্ড অপসারণ করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

খোরশেদ আলম: হয়তো উনি চেয়েছিলেন ভালো কিছু হোক। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে ভুল ছিল। যারা সৌন্দর্যবর্ধন করেছে, তারা বিজ্ঞাপন চালাতে পারে। তবে তা যেন দৃষ্টিকটু না হয়, চলার পথে ঝুঁকি সৃষ্টি না করে। তাহলে তো সেই বিলবোর্ডের মতোই হয়ে গেল। যেমন ধরেন ফুটপাতের মধ্যে দোকান, ঘন ঘন যাত্রী ছাউনি করার অনুমতি দিয়েছেন। যেখানে বাস দাঁড়ায় না সেখানে যাত্রী ছাউনি করা হয়েছে। এখন আমি যদি ফুটপাতে দোকান বানাই, তাহলে হকারকে কীভাবে বলি, তুমি ফুটপাতে বোসো না।

আপনি দলের চট্টগ্রাম নগরের সহসভাপতি। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোন্দলের কোনো সুরাহা হবে না?

খোরশেদ আলম: কোন্দল নেই, দলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। তবে সে প্রতিযোগিতা যেন প্রতিহিংসায় পরিণত না হয়। পার্টি যখন ক্ষমতায় তখন কিছু লোক সৃষ্টি হয়। তারা নিজের স্বার্থে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের কোন্দল রয়ে গেছে।

খোরশেদ আলম: চট্টগ্রাম কলেজ হচ্ছে সেরা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেখানে যারা চাঁদাবাজি করছে, অপকর্ম করছে, তারা কেউ জীবনে কলেজে পড়েছে কি না সন্দেহ। কলেজটাকে দখলে নিয়ে চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার করছে। এর আগে শিবিরের ওরাও একই কাজ করত।

দলের নেতৃত্ব কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?

খোরশেদ আলম: তারা নেতৃত্ব মানে না। মানবেই বা কেন। কেউ না কেউ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। তাদের অপকর্মের সব দায়ভার পড়ছে দলের ওপর। তাই দলকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুনেছি সিটি করপোরেশনের আয়ের সংকট। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা হচ্ছে না।

খোরশেদ আলম: করপোরেশনের যে ধরনের ব্যয় সে অনুপাতে আয় নেই। তবে আপনি যদি ১০০ কোটি টাকার সম্পদ ১ লাখ টাকায় দিয়ে দেন তাহলে আয় হবে কীভাবে। এদিক-ওদিক কিছু দোকান করে দিলে আয় বাড়ানো যাবে না। আয় বাড়াতে হলে এই শহরের ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, তাদের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে। এই শহরের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে বন্দর। প্রোডাক্টিভ বন্দরের জন্য একটি সচল শহর দরকার। রাস্তাগুলো ৫ টনের লোড নিতে সক্ষম, সেখানে গাড়ি চলে ৩০-৩৫ টনের। সে জন্য বন্দরকে একটি উন্নয়ন চার্জ দিতে হবে। যাতে রাস্তাঘাট ঠিকমতো তৈরি করে শহর সচল রাখা যায়।

চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটের অবস্থা তো বেহাল।

খোরশেদ আলম: এক পিসি রোড নিয়ে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় আছে। তবে এখন কাজ চলছে। কিন্তু কাভার্ড ভ্যানগুলো রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এটার সমাধান করতে হবে। এটা একটা বন্দর নগর। কিন্তু ট্রাক টার্মিনাল নেই। অথচ সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল এই টার্মিনালের। সিটি করপোরেশন কুলগাঁওতে বাস টার্মিনাল করবে। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে ডিসি অফিস জায়গা বুঝিয়ে দিতে পারছে না। আসলে এই শহরে অনেক কিছু করা দরকার। এ জন্য সরকারকে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কেননা আগামী ৫-১০ বছরের এই শহরের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যাবে। টানেল হচ্ছে, শিল্প এলাকা হচ্ছে। ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন হচ্ছে। এসব হলে অর্থনীতির স্বর্ণদুয়ার খুলে যাবে।

আপনাদের সেই প্রস্তুতি কি আছে?

খোরশেদ আলম: সেই প্রস্তুতি নিতে হলে সরকারকে হস্তক্ষেপ করে আমাকে যথেষ্ট ক্ষমতা দিতে হবে।

সেবা সংস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কথা বলছেন। নগর সরকার কি এর সমাধান?

খোরশেদ আলম: দেখুন, নগর সরকার নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি। সিটি করপোরেশনের মাসিক সভায় প্রতিটি সেবা সংস্থার প্রধানদের উপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু উপস্থিত না থাকলে কী হবে তা লেখা নেই। এখন সভা হলে সেখানে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়, যাঁরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না। সভা ডাকলে অনেকে চেয়ার মাপেন, কার চেয়ার উঁচু বা কার চেয়ার নিচু। আমিই এখন প্রতিটি সেবা সংস্থার প্রধানদের কাছে যাচ্ছি।

আর চার মাস বাকি আছে। কী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন।

খোরশেদ আলম: প্রথমেই চাচ্ছি নগরের ভাঙা রাস্তাঘাট ঠিক করে দেব। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নগর করতে চাই। যাতে নাকে রুমাল দিয়ে হাঁটতে না হয়। আগামীর জন্য কাজের ভিত্তি তৈরি করে যাচ্ছি। চারাগুলো একদিন বড় হবে। সবাই যদি যত্ন নেন তাহলে চট্টগ্রামের জনগণ সুফল পাবেন।

প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

খোরশেদ আলম: প্রথম আলোকে ধন্যবাদ।